• ২১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

এই স্বীকৃতিতে কী আসে যায়?

দখিনের সময়
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৫, ১৪:৪১ অপরাহ্ণ
এই স্বীকৃতিতে কী আসে যায়?
সংবাদটি শেয়ার করুন...
ইহুদি জাতীকে সঠিকভাবে চিনতে পেরেছিলেন দূরদর্শী হিটলার। কিন্তু যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তিনি ভিলেন হিসেবে পরিগনিত হয়েছে বিজয়ীদের এক তরফা প্রচারণার তোড়ে। এবং সেই শীবের গিতের ধারা চির চলমান। কিন্তু ইহুদিরা যে কী বস্তু তা বারবার প্রমানিত হয়েছে। আর এখন নিষ্ঠুর প্রমান পর্ব চলছে ফিলিস্তিনে। ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজা এখন অসম যুদ্ধক্ষেত্র। গত দুই বছর ধরে লাগাতার ইসরাইলী ধ্বংসজজ্ঞ ও গণহত্যার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে গাজা। ইসরায়েলি বর্বরতায় গাজা উপত্যকার বাসিন্দারা অকল্পনীয় যন্ত্রণা, ভোগান্তি এবং দুর্দশা’র মধ্যে আছেন। পাশাপাশি মানবিক সহায়তা থেকেও বঞ্চিত।
এ অবস্থায় ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ক্ষমতাধর চার রাষ্ট্র। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পথ অনুসরণ করে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে ইউরোপের আরেক দেশ সান মারিনো। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে চীন ও রাশিয়া। এবং এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে অন্তত ৭৫ ভাগই ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। অরো আছে। তা হচ্ছে, জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সদস্যপদ স্থায়ী পর্যবেক্ষক হিসেবে। পুরো ফিলিস্তিনকে মিলেমিশে ধ্বংস করার পর রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ার বাঁধ ভাঙ্গা এই প্রেমের ফজিলত কী? কারো কারো মতে, এ হচ্ছে এক ধরনের তামাশা, হারামীপানা!
ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলী তান্ডবে যখন একটি জাতি-জনগোষ্ঠি-জনপদকে প্রায় পুরোটাই ধ্বংসের দিকে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব মিডিয়ায় বেশ গুরুত্বসহকারে খবর প্রকাশিত হয়েছে, ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া। এরপর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় বলেন, “শান্তি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান পুনরুজ্জীবিত করতে আমি আজ অসাধারণ এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করছি, “যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।” কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, “কানাডা ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। একইসঙ্গে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠনে অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।” ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি ‘দানের মহান কর্মে’ ২২ সেপ্টেম্বর যুক্ত হয়েছে আর এক পরাশক্তি ফ্রান্স। এরপর প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের আল-আকসা অঞ্চলে শান্তিপূর্ণভাবে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতির বাস্তবায়নই ফ্রান্সের একমাত্র দাবি।” ম্যাক্রোঁ আরো বলেন, “সত্যি বলতে, প্রতিটি জীবন মূল্যবান। ফিলিস্তিনিরা নিদারুণ ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। তাদের জীবন চুরি যাচ্ছে, কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা যা চাই, ফ্রান্স যা চায়- তা হলো শান্তি।” ম্যাক্রোঁর বক্তব্যে বড় নকতা আছে। তিনি বলেছেন। “আমরা ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবো, কিন্তু সেখানে দূতাবাস স্থাপন করব তখনই, যখন গাজার সব জিম্মি মুক্তি পাবে।” কারো মতে এটিই হচ্ছে মূল লক্ষ্য।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই স্বীকৃতি দানে আসলে কী আসে যায়? প্রসঙ্গত, এ ব্যাপারে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে পশ্চিম তীরের বাসিন্দারা। আর ইসরায়েলের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, ‘এই স্বীকৃতি জিহাদি হামাসের জন্য উপহার ছাড়া আর কিছু নয়।’ কিন্তু আসলে কী? এ প্রসঙ্গে অতীতে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। আর একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, হঠাৎ দৃশ্যমান বিষয় আসলে হঠাৎ ঘটে না। সব কিছুরই অতীতের পথ পরিক্রমা থাকে। যা হতে পারে স্বল্প অথবা দীর্ঘ। ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে অতীতের পথ পরিক্রমা অনেক দীর্ঘ। এবং এর জটিলতার শিকড় অনেক গভীরে। কাজেই এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া অনেকটাই প্রতীকী। বাস্তবতা হচ্ছে, এই স্বীকৃতিতে পরিস্থিতি খুব একটা পরিবর্তন হবে না।
ইতিহাস বলে, ১৯১৭ সালের বেলফোর সনদ একটি বড় বিষয়। তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোরের তত্ত্বাবধানে স্বাক্ষরিত এ সনদে বলা হয়েছিল, ফিলিস্তিনে থাকা ইহুদি নয়; এমন মানুষের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুন্ন করে এমন কোনও কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না।
প্রসঙ্গত, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ১৯২২ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত জাতি সংঘের এক ম্যান্ডেটের আওতায় ব্রিটিশ রাজ দখলে রেখেছে। এরপর ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র তৈরি হয়। ইসরাইলের পাশাপাশি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াসও চলতে থাকে। ডেভিড ল্যামির মত বহু বিশ্ব মোড়ল ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ গীত বারবার উচ্চারণ করেছেন। এক ধরনের ধারণা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে, পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন হবে। কিস্তু বাস্তবে তা হয়নি।
ইসরাইল-আরব যুদ্ধের আগে ওই অঞ্চল যেভাবে বিভক্ত ছিল, সেই বিভক্তির ভিত্তিতেই দুই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে বলে বলা হয়েছিল। ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের পর ইসরাইলের দখলে চলে যাওয়া পূর্ব জেরুজালেম হওয়ার কথা ছিল ফিলিস্তিনের রাজধানী। কিন্তু তা হয়নি, হয়নি কোন সমাধানও। বরং পশ্চিম তীরে ইসরাইলের অবৈধ দখল যত বেড়েছে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান কথাটি ততই ফাঁকা বুলি হিসেবেই প্রমানিত হয়েছে। এর মধ্যে একটি জাতিকে নিধন তান্ডবের মধ্যেই এখন স্বীকৃতি দান করা হচ্ছে। কিন্তু এই স্বীকৃতির আসলে অর্থ কী? এর ফলে কী পরিবর্তন হতে পারে?
প্রসঙ্গত, কাগজে কলমে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বলে কিছু নেই। ফলে উল্লেখিত স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি হচ্ছে শূন্যে প্রাসাদ বানাবার মতো। তবে এর আগেও রাষ্ট্র হিসেবে বহু দেশ এই ভূখণ্ডকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে ফিলিস্তিনের কূটনৈতিক মিশনও রয়েছে। অলিম্পিকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণও করে ফিলিস্তিন। কিন্তু ফিলিস্তিনের কোনও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানা, রাজধানী বা সেনাবাহিনী নেই। পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর বহু বছরের দখলদারিত্ব চলার পর ১৯৯০এর দশকে প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটি প্রতিষ্ঠিত হয়। যাদের ওই ভূখণ্ড এবং সেখানে বসবাসকারী মানুষের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
কারোকারো মতে, দুই বছর ধরে চলমান ইসরাইলী তান্ডবের ফলশ্রুতিতে বিশ্ব জনমনে যে ক্ষোভ আর ঘৃনা তৈরী হয়েছে তার আঁচ থেকে এক রকম নিরাপদে থাকার কৌশল ছাড়া বাহারী স্বীকৃতি আর কিছু নয়। আবার কারো বিবেচনায় উল্লেখিত স্বীকৃতির মুল্য আসলে নানান আয়োজনে গলায় ঝুলিয়ে দেয়া মেডেলের মতোই। যা কেবল ক্ষণিকের মানসিক প্রশান্তি দেয়, বাস্তবে কোন উপযোগ নেই।