• ১লা এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

মরে যাচ্ছে কীর্তনখোলা-সুগন্ধা: নদী খাদক অপসোনিন

দখিনের সময়
প্রকাশিত এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ
মরে যাচ্ছে কীর্তনখোলা-সুগন্ধা: নদী খাদক অপসোনিন

মামুনুর রশীদ নোমানী, অতিথি প্রতিবেদক:
বরিশালের সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনা দখল করেছে প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ‘অপসোনিন’। দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। নদীর তীর ও মোহনার বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ফেলা, জমি দখল, পরিবেশ ধ্বংস এবং জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করছে। মোহনা এখন আর শুধু প্রাকৃতিক জলপথ নয়- এটি পরিণত হয়েছে দখল আর দূষনের ভাগারে। ফলে মরে যাচ্ছে কীর্তনখোলা ও সুগন্ধা। সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ স্থানীয় নেতা আমির হোসেন আমুর প্রভাবকে ব্যবহার করে নদী দখল করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্র।
সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনায় বিশাল এই স্থাপনা যেন বাংলাদেশের লাগামহীন নদী দখলের এক ভয়াবহ নিদর্শন। এদুটি কেবল নদীপথ নয়, বরং এ অঞ্চলের অর্থনীতি, জীবিকা ও পরিবেশের প্রাণকেন্দ্র। দখল ও দূষণের এই চক্র অব্যাহত থাকলে তা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সুগন্ধা ও কীর্তনখোলার মোহনায় যা ঘটছে তা শুধু একটি নদী দখলের ঘটনা নয়- এটি পরিবেশ, অর্থনীতি, ভূমি অধিকার ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সম্মিলিত সংকট।
জানা গেছে, গত কয়েক বছরে ধীরে ধীরে নদীর তীর ঘেঁষে মাটি ভরাট, স্থায়ী বিশাল কংক্রিট দেয়াল নির্মাণ এবং স্থাপনা নির্মানের মাধ্যমে দখল প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে। শুরুতে ছোট পরিসরে কাজ হলেও ক্রমান্বয়ে তা বড় শিল্পকারখানার রূপ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমে কারখানাটি ছোট্ট একটি জায়গায় গড়ে ওঠে। কিন্তু প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নদীতে বালু ফেলে ধীরে ধীরে তারা জায়গা বাড়াতে থাকে। রাতের আঁধারেও সেই কাজ চলত। ফলে নদীপথে নাব্যতা সংকট সৃষ্টি করছে, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ ব্যাহত করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জেলে বলেন, নদীকে ভূমিতে পরিনত করেছে অপসোনিন।
১. নদীর বুকে ‘শিল্প সাম্রাজ্য’
স্থানীয় সূত্র ও তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠির দপদপিয়া ও তিমিরকাঠী সংলগ্ন এলাকায় সুগন্ধা ও বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর ভেতরে ৫০ একরের বেশি এলাকা ভরাট করে শিল্প স্থাপনা সম্প্রসারণের অভিযোগ রয়েছে। নদীতে কংক্রিট ব্লক ফেলে ধীরে ধীরে চর সৃষ্টি করে সেই চর পরে কোম্পানির জমির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ সংকুচিত হয়েছে।
২. সিকিস্তি জমি দখলের অভিযোগ
নদীভাঙনে বিলীন হওয়া জমি পরে জেগে উঠলে তা সরকারের। এবং পূর্ব মালিকদের পাওয়ার কথা। অথবা পাবে দুস্থরা। কিন্তু অভিযোগ আছে, সেই জমি দখল করে শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শতাধিক পরিবার তাদের জমি ফিরে পাবার চেষ্টারই সুযোগ পাচ্ছে না। দখল ঠেকাতে গেলে হামলা-হুমকির অভিযোগও রয়েছে।
৩. দূষণের ভয়াবহ চিত্র
অপসোনিন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, ময়লা, প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ছে, যা পানিকে বিষাক্ত করে তুলছে। ফলে পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। মাছ ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে ও নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে। নদীর ভেতরে বালু ভরাট করা হয়েছে। তীর ঘেঁষে গাইড ওয়াল ও শিল্প অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। নদীর অংশ নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে নদীর প্রাকৃতিক সীমানা প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
৪. সুগন্ধায় ভাঙন
শুধু কীর্তনখোলা নয়, পাশের সুগন্ধা নদীতেও সংকট বাড়ছে। অপসোনিন দুটি নদীরই অংশ দখল করে নিয়েছে। যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে নদীগুলোর প্রাকৃতিক প্রবাহ ও পরিবেশ ব্যবস্থায়। প্রতিবেদনে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
তীব্র ভাঙনে গ্রাম, রাস্তা, প্রতিষ্ঠান বিলীন, নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হুমকির মুখে। মোহনা অঞ্চলে কৃত্রিম বাধা ও দখল দপদপিয়া ও তিমিরকাঠি মৌজার অংশের ভাঙনকে আরও তীব্র করেছে। এছাড়া দপদপিয়া-নলছিটি সড়কটি এখন ভাঙনের মুখে।
৫. প্রশাসনের ভূমিকা
রহস্যজনক
প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, দখলের বিষয়ে অভিযোগ পাওয়া গেলেও কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা দেখা যায়নি। নদী রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও প্রকট। একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, নদী দখল ঠেকাতে আইনি কাঠামো আছে, কিন্তু প্রয়োগে দুর্বলতা রয়েছে। প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে অনেক সময় অভিযান থেমে যায়। এদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত মাসোয়ারা নিয়েই সন্তষ্ট। এ অভিযোগ আছে মহানগর পুলিশের বিরুদ্ধেও।
৭. বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
পরিবেশবিদদের মতে নদীকে ‘জীবন্ত সত্ত্বা’ হিসেবে আইনী স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবে তা রক্ষা হচ্ছে না। ফলে নদী মরে যাবার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে মোহনা অঞ্চল নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পলি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাধা সৃষ্টি হলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়, ব্যাহত হয় মাছের প্রজনন, নৌ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবেশকর্মীরা জানান, শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে পানির রং পরিবর্তিত হয়েছে। অনেক এলাকায় তেলজাতীয় পদার্থ ভাসতে দেখা গেছে। এই নদী বুড়িগঙ্গার মতো হতে চলেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
৮. নদী খাদক অপসোনিনের বক্তব্য
অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান ‘অপসোনিন’-এর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয়েছে, তারা কোনো অবৈধ দখলে জড়িত নয়। তাদের দাবি, সব স্থাপনা বৈধ অনুমোদনের ভিত্তিতেই নির্মান করা হয়েছে। এবং পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

[post-views]