বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, আমরা যেমন দেশের
পানির সর্বনাশ করে ফেলেছি, তেনেই
মাদকও আমাদের সর্বনাশ করে
ফেলছে, ফেলেছে!
মাস খানেক আগে তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশে এক কোটি মানুষ মাদকাশক্ত।’ সঙ্গে আমার এক ধরনের আতংকের অনুভূতি হলো। অনেক সময় জানাকথা শুনলেও ভয় লাগে। যেমন চট্টগ্রামে যাবার কথা শুনলে জেনালের এরশাদ নাকি ভয় পেতেন। এমন রটনা আছে। এ ব্যাপারে একটি রসালো গল্প হচ্ছে, যে নরসুন্দর জেনারেল এরশারে চুল কাটতেন সে তার কর্ম সম্পাদনের সময় জিজ্ঞেস করতেন, ‘স্যার চট্টগ্রাম কবে যাবেন?’ এরশাদ নিশ্চুপ থাকতেন। এক পর্যায়ে তাঁর মনের গহীনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। তিনি গোয়েন্দা প্রধানকে বিষয়টা দেখার জন্য বললেন। ব্যাস! নরসুন্দকে ধরে নেয়া হলো। ব্যাপক জিজ্ঞাসাদ শুরু করার আগেই ভ্যা করে কেঁদিয়ে বেচারা নরসুন্দর বললো, ‘চট্টগ্রামের কথা বললে স্যারের চুল দাড়িয়ে যায়, আমার কাটতে সুবিধা হয়।’ বলতে গেলে আমারও একই দশা, তবে চট্রগ্রামের বিষয়ে নয়। এ অবস্থা হয় মাদকের ব্যাপারে। আমার একমাত্র ছেলে এখন টকবগে যুবক, হাইকোর্টের উকিল। তাঁর কিশোর বয়সে আল্লা-আল্লা করতাম, আমার ছেলে খুন মামলায় পড়লেও যেনো মাদকের নেশায় না পড়ে। আমি অনেক খুনমামলার আসামীকে চিনি যারা দেশেরর এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু কোন মাদকাশক্ত নিজেকে নিঃশেষ করা ছাড়া আর কিছু পারেন না।
উল্লেখ্য, পেশাগত কারণে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমার একটু বেশীই ধারণা রয়েছে। এদিকে বহু বছর আগে অরুপ রতন চৌধুরীকে এক বক্তৃতায় বলতে শুনেছি. ‘নেশার গুরু, ধূমপান দিয়ে শুরু!’ সেই বক্তৃতা আমার মগছে এতোটাই গেথেগেছে যে, ধুমপায়ী কাউকে আমার বাসার ত্রি-সীমায় ঘেষতে দিতাম না। কিন্তু আমার বাসা থেকে বের হলেই পথের দুই ধারে পঞ্চাশ গজের মধ্যে অন্তত পঞ্চাশ জন মাদকাশক্তকে চিনতাম। দেখেছি পরিবারে অসহায় দশা, আর মাদকাশক্ত তরুন-কিশোরের করুণ পরিণতি। কিন্তু কিছুই করার ছিলো না। এমন কি রিপোর্ট করারও সাহস হয়নি কখনো। বহু বছর পড়ে বিভিন্ন পত্রিকায় মাদকের আগ্রাসন প্রসঙ্গে ইনিবিনিয়ে কলাম লেখার কিঞ্চিত সাহস দেখালাম। আমি জানতাম, এই লেখা বেফজুল, এক ধরনের অরণ্যে রোদন। এরপরও বরিশালে মাদক চক্রের হামলার শিকার হয়ে ৯দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হামলার ঘটনায় থানায় মামলা করেছি, আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, জেলহাজতে গেছে। দেড় মাসের মাথায় জামিনে বেরিয়েছে। আদালতের বিচারে বছর চারেকের মাথায় আসামীরা ‘নির্দোষ’ প্রমানিত হয়েছেন। যেনো আমার উপর কোন হামলাই হয়নি, হয়তো আমার হাত ভেঙ্গেছে বাতাসে! আমি এই কষ্ট নিয়ে আছি। ইশরাক হোসেনও কি মাদক প্রশ্নে এ রকম অথবা আরো বড় কোন কষ্ট দ্বারা প্রভাবিত? যে কারণে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজেই বন্দুক নিয়ে অ্যাকশনে নেমেছিলেন, কে জানে! তিনি কেন বুঝলেন না, করা নয় মন্ত্রীর দায়িত্ব করানো।
ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রী হয়েও যে মাদকের বিরুদ্ধে নিজেই ‘অভিযানে’ নেমেছিলেন সেই মাদকের আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। অনেকের বিবেচনায়, রাজনীতির অনেক অনুষ্ঠান, এমন কি মাদক বিরোধী অনেক অনুষ্ঠন চলে মাদক কারবারীদের টাকায়। এদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গুরুত্বপুর্ণ অবস্থানে আসীন থাকার উদারণও আছে। এমনকি শেখ হাসিনার রাজত্বে সংসদ সদস্যও হয়েছেন দেশের মাদক ব্যবসায় টাইকুন বদি। আবার এটি মনে করার কোন কারণ নেই, মাদক কারবারীরা কেবল শেখ হাসিনার সময় ক্ষমতাধর ছিলো। এরা চিরকালই ক্ষমতাধর।
বাংলাদেশে ইয়াবার প্রথম চালাক আটক করা হয় ২০০২ সালে। তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক ছিলেন মোহাম্মদ সালাম। আর ইয়াবার প্রথম চালান আটক করার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন পরিচালক (অপরারেশন) মজিবুর রহমান হাওলাদার। এই ইয়াবার চালান ধরার ‘অপরাধে’ এক ফাক্স বার্তায় বাতিল করা হয় তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। আর মজিবুর রহমান হাওলাদারকে বদলী করা হয় নখদন্তহীন দুদকে। বলা হয় সেই ঘটনায় একটা স্পষ্ট ম্যাসেস পায় মাদক কারবারীরা, প্লাবনের গতিতে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে ইয়াবা! সেই গতি যে দেশকে কোন দুর্গতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত একটি গবেষণায়।
চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিক এ গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এ গবেষণা সম্পন্ন হয়। গবেষণায় দেশের ৮টি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। সিগারেটকে মাদক হিসেবে বিবেচনায় না নিয়েও দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবৈধ মাদকে আসক্ত। মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ব্যবহারকারীদের বড় অংশ খুব অল্প বয়সে মাদকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছেন। আর ৫৯ শতাংশের শুরু ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। সঙ্গে প্রয়োজন ইশরাক হোসেনের মতো কিছু মানুষ। যাদেরকে আপতদৃষ্টিতে স্বল্প বোধ সম্পন্ন মনে হতে পারে। এতো কিছুর পরও, কোনই সন্দেহ নেই, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সিনেমার স্টাইলে অস্ত্র প্রদর্শন করে অ্যাকশনে নেমে মোটেই ভালো কাজ করেননি, সাধরণ বিবেচনায় খারাপ কাজ করেছেন ইশরাক। কিন্তু যে কাজ প্রতিমন্ত্রী করার কথা নয়, সেই কাজ করার জন্য তো পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ছিলো এবং আছে। তারা কি করেছে? সহজেই বোধগম্য, বখড়া নেয়া ছাড়া আর কিছুই করেননি। কিন্তু তাদের কাউকে তো সরানো হয়নি। কেবল সরানো নয়, তাদের তো জেলে নেয়া উচিত। কিন্তু এই উচিত কাজটিই তো এখনো হয়নি। আর হবে বলেও মনে হয় না।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিমন্ত্রীর বিদাযের ফলে মাদক কারবারীদের কাছে কি ম্যাসেজ গেলো? এটি অনেককে ভাবচ্ছে! অরো ভাবনার বিষয় হচ্ছে, পুলিশের বক্তব্য নিয়ে। ইশরাকের ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছিলো, নিয়ম বা আইন ভঙ্গ করেছেন কিনা তা খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইন লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম ১৮ অক্টোবর জানান, আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন. ‘এ বিষয়ে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপ-কমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যাত্যয় পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবচন আছে, ‘অসময়ে বর্ষাকাল, হরিনে চাটে বাঘের গাল!’ যে পুলিশ টোকাই মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না অথবা পারে না, তারা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘যথাযথ’ আইনি ব্যবস্থা নেয়ার আওয়াজ দেয়। এ যেনো ল্যাংড়ার পাড়ার ডিঙ্গানোর খায়েস। অবশ্য পুলিশের এইসব বাকোয়াজ কথাবর্তায় মানুষের তেমন আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। আর পুলিশ কি পারে আর পারে না, সেবিষয়ে দেশবাসীর বিস্তর জ্ঞাণ আছে। পুলিশ প্রসঙ্গ থাক।
আসাযাক ইশরাক প্রসঙ্গ। মাদক বিরোধী অভিযানে সাধারণ দৃষ্টিতে সীমা লংঘনের কারণে ইশরাককে পদত্যাত করতে বলা হয়েছে বলে ১৮ অক্টোর রাতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। যদিও বিষয়টিকে তিনি প্রথমে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই তিনি বিষয়টি স্বীকার করেনিয়েছেন। এবং ১৯ অক্টোবর দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এ সময় তিনি বলেন, পুরো সময়টা ঢাকা-৬ আসন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাদক নির্মূল ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন।’
মনে রাখা প্রয়োজন, মাদক বিরোধী অভিযানের সময় ইশরাক হোসেনের সাধারণ দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য এ্যাকশনে মাদকের যে খন্ডচিত্র ফুটে উঠেছে সেটা দেশেরই প্রতিচ্ছবি, যা দেশ-জাতির জন্য ভয়ংকর। এ অবস্থায় শেষ কথা হচ্ছে, ইশরাক হোসেন যেনো তার কথা রাখেন। তিনি বলেছেন, ‘‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপি কর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে।” আর দেশবাসীর প্রত্যাশা, বাংলাদেশে যেনো অসংখ্য ইশরাক হোসেন তৈরী হয়। এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেনো ইশরাকদের সঙ্গে থাকেন। যেকেউ বুঝবেন, প্রধানমন্ত্রী পাশে না থাকলে দেশকে মাদকের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, আমরা যেমন দেশের পানির সর্বনাশ করে ফেলেছি, তেনেই মাদকও আমাদের সর্বনাশ করে ফেলছে, ফেলেছে!
লেখক, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক