মহান আল্লাহ তাআলা এই পৃথিবীতে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন—এ এক চিরন্তন সত্য। মানুষকে দিয়েছেন বিবেক, বুদ্ধি ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য বোঝার ক্ষমতা। কিন্তু আজ বিবেকের কাছে আমার প্রশ্ন—মানুষ অপরাধ করে কেন? আর অপরাধ করার পরও তার মনে অপরাধবোধ জাগে না কেন? আজকের সমাজব্যবস্থায় এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলছে সাহস, শক্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি। আর সেই নীরবতার সুযোগে অপরাধীরা অনুতপ্ত হওয়ার পরিবর্তে নিজেদের আরও শক্তিশালী ও গর্বিত মনে করছে। প্রশ্ন জাগে, আমাদের সমাজে কি দায়িত্ববোধসম্পন্ন, বিবেকবান মানুষের অভাব পড়েছে?
একজন অপরাধী অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন করবে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানুষের অধিকার কেড়ে নেবে, অসামাজিক ও নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পুরো সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেবে—আর আমরা সামাজিক জীব হয়েও নীরবে সবকিছু সহ্য করে যাব? এভাবে কি একটি সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব? আজ আমাদের সমাজের অন্যতম ভয়াবহ সংকট মাদকদ্রব্যের বিস্তার। মাদকের বিষাক্ত ছোবলে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য তরুণের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ। একটি পরিবার হারাচ্ছে তার প্রিয় সন্তানকে, একটি সমাজ হারাচ্ছে তার কর্মক্ষম শক্তিকে। মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না; ধীরে ধীরে একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং পুরো সমাজকে অসুস্থ করে তোলে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা আজ সময়ের দাবি।
অন্যদিকে, জুলুম, অত্যাচার ও নির্যাতনের মাধ্যমে অসহায় মানুষকে শোষণ করা হচ্ছে। প্রকৃত অধিকারীকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। গুটিকয়েক স্বার্থান্বেষী মানুষের সংঘবদ্ধ প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারে সাধারণ মানুষ অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়ছে। একটু গভীরভাবে ভাবুন—একজন দরিদ্র মানুষের সামান্য অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়ার সময় আমাদের বিবেক কোথায় থাকে? তার চোখের জল, অসহায়ত্ব ও নীরব কষ্ট কি আমাদের হৃদয়কে একটুও নাড়া দেয় না? মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, সম্পদ চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু অন্যায়ের পরিণতি একদিন না একদিন সামনে আসবেই। যে সমাজে অন্যায়কারী নির্ভয়ে অন্যায় করে আর বিবেকবান মানুষ ভয়ে নীরব থাকে, সে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ে। নীরবতা কখনো কখনো অন্যায়কে আরও সাহসী করে তোলে।
তবে প্রতিবাদ মানেই বিশৃঙ্খলা নয়; প্রতিবাদ মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো, ন্যায়ের দাবি তোলা এবং মানুষের অধিকার রক্ষায় শান্তিপূর্ণভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। সমাজের বিবেকবান মানুষ যদি অন্যায়, অবিচার, মাদক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত পথে একসঙ্গে দাঁড়াতে পারেন, তাহলে পরিবর্তনের পথ অবশ্যই তৈরি হতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সমাজ পরিবর্তনের দায়িত্ব শুধু কোনো একজন মানুষের নয়—এ দায়িত্ব আমাদের সবার। গরিব, অসহায় ও অধিকারবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে কথা বলা এবং সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রতিটি সচেতন নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আসুন, আমরা প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার চাই; সংঘাত নয়, শান্তি চাই; ক্ষমতার দাপট নয়, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা চাই। আসুন, বিবেককে জাগ্রত করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হই এবং এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে অপরাধী অপরাধ করে গর্বিত হবে না, অসহায় মানুষ অধিকার হারিয়ে কাঁদবে না, আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষ ভয় নিয়ে বাঁচবে না।
জেগে উঠুক মানুষের বিবেক, জাগ্রত হোক জনতার শক্তি।
ঐক্যবদ্ধ হোক ন্যায়ের পক্ষের মানুষ, প্রতিষ্ঠিত হোক সামাজিক সমতা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ গড়ে উঠুক,
আগামীর সমাজ হোক শান্তিময়, সহনশীল ও বসবাসযোগ্য।