1. অপরাধ
  2. অর্থনীতি
  3. আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. খেলাধুলা
  6. চাকরি
  7. জাতীয়
  8. জীবনযাপন
  9. পুঁজিবাজার
  10. ফিচার
  11. বাণিজ্য
  12. বাংলাদেশ
  13. বিনোদন
  14. বিশ্ব
  15. ভিডিও
আজকের সর্বশেষ সবখবর

প্রধানমন্ত্রী যেন ইশরাকদের সঙ্গে থাকেন

dokhinersomoy
October 24, 2026 3:29 pm
Link Copied!

মাসখানেক আগে তথ্যমন্ত্রী ব্যারিস্টার আন্দালিভ রহমান এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশে এক কোটি মানুষ মাদকাসক্ত।’ এতে আমার এক ধরনের আতঙ্কের অনুভূতি হলো। আতঙ্কের বিষয়টি জানা কথা, তবুও শুনলে ভয় লাগে। চট্টগ্রামে যাওয়ার কথা শুনলে জেনারেল এরশাদের যেমন হতো বলে রটনা আছে। এ ব্যাপারে একটি রসালো গল্পও আছে। যে নরসুন্দর জেনারেল এরশাদের চুল কাটতেন, তিনি প্রায়ই জিজ্ঞেস করতেন, স্যার চট্টগ্রাম কবে যাবেন? এরশাদ নিশ্চুপ থাকতেন। তার শুধু মনে পড়ত, জেনারেল মঞ্জুরের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের কথা। একপর্যায়ে তার মনের গহিনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। তিনি গোয়েন্দাপ্রধানকে বিষয়টাটি দেখার জন্য বললেন। ব্যস! নরসুন্দকে ধরে নেওয়া হলো। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করার আগেই ভ্যাঁ করে কেঁদে বেচারা বলল, ‘চট্টগ্রামের কথা বললেই স্যারের চুল দাঁড়িয়ে যায়, আমার কাটতে সুবিধা হয়।’ বলতে গেলে আমারও একই দশা, তবে চট্টগ্রামের বিষয়ে নয়। এ অবস্থা হয় মাদকের ব্যাপারে। আমার একমাত্র ছেলে এখন টগবগে যুবক, হাইকোর্টের উকিল। তার কিশোর বয়সে আল্লাহ-আল্লাহ করতাম, অমার ছেলে খুনের মামলায় পড়লেও যেন মাদকের নেশায় না পড়ে। আমি অনেক খুনিকে চিনি, যারা দেশের এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, কিন্তু কোনো মাদকাসক্ত নিজেকে নিঃশেষ করা ছাড়া আর কিছু পারে না।
বলাবাহুল্য, পেশাগত কারণে মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমার একটু বেশিই ধারণা ছিল। এদিকে বহু বছর আগে অরুপ রতন চৌধুরীকে এক বক্তৃতায় বলতে শুনেছি. ‘নেশার গুরু, ধূমপান দিয়ে শুরু!’ সেই বক্তৃতা আমার মগজে এতটাই গেঁথে গিয়েছিল যে, ধূমপায়ী কাউকে আমার বাসার ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিতাম না। কিন্তু অমার বাসা থেকে বের হলেই পথের দুই ধারে ৫০ গজের মধ্যে অন্তত ৫০ জন মাদকাশক্তকে চিনতাম। দেখেছি পরিবারের অসহায় দশা, আর মাদকাসক্ত ব্যক্তির করুণ পরিণতি। কিন্তু কিছু করার ছিল না। এমনকি রিপোর্ট করারও সাহস হয়নি কখনো। বহু বছর পরে বিভিন্ন পত্রিকায় মাদকের আগ্রাসন প্রসঙ্গে ইনিয়েবিনিয়ে কলাম লেখার সাহস দেখালাম। আমি জানতাম, এই লেখা এক ধরনের অরণ্যে রোদন। এরপরও বরিশালে মাদক চক্রের হামলার শিকার হয়ে ৯ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। হামলার এ ঘটনায় থানায় মামলা করেছি, আসামি ধরা হয়েছিল। কিন্তু আদালতের বিচারে আসামিরা ‘নির্দোষ’ প্রমাণিত হয়েছে। যেন অমার ওপর কোনো হামলাই হয়নি, হয়তো আমার হাত ভেঙেছে বাতাসে! আমি এই কষ্ট নিয়ে আছি। ইশরাক হোসেনও কী এ রকম অথবা আরও বড় কোনো কষ্ট দ্বারা প্রভাবিত হয়ে, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজেই বন্দুক হাতে অ্যাকশনে নেমেছিলেন, কে জানে! তিনি কেন বুঝলেন না, মন্ত্রীর কাজ করা নয়, করানো। ইশরাক হোসেন প্রতিমন্ত্রী হয়েও যে মাদকের বিরুদ্ধে নিজেই ‘অভিযানে’ নেমেছিলেন সেই মাদকের আগ্রাসন নতুন কিছু নয়। অনেকের বিবেচনায়, রাজনীতির অনেক অনুষ্ঠান, এমনকি মাদকবিরোধী অনেক অনুষ্ঠান চলে মাদক কারবারিদের টাকায়। এদিকে মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার উদারণও আছে। এমনকি শেখ হাসিনার রাজত্বে সংসদ সদস্যও হয়েছেন দেশের স্বীকৃত মাদক ব্যবসায়ী বদি। আবার এটি মনে করার কোনো কারণ নেই, মাদক কারবারিরা শুধু শেখ হাসিনার সময় ক্ষমতাধর ছিল। এরা চিরকালই ক্ষমতাধর।
বাংলাদেশে ইয়াবার প্রথম চালান আটক করা হয় ২০০২ সালে। তখন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ছিলেন মোহাম্মদ সালাম। আর ইয়াবার প্রথম চালান আটক করার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন পরিচালক (অপরারেশন) মজিবুর রহমান হাওলাদার। এই ইয়াবার চালান ধরার ‘অপরাধে’ মহাপরিচালকের পদ থেকে মোহাম্মদ সালামকে অপসারণ করা হয়েছিল, এক ফ্যাক্স বার্তায় বাতিল করা হয় তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। আর মজিবুর রহমান হাওলাদারকে বদলি করা হয় সেই সময়ে নখদন্তহীন দুদকে। বলা হয়, সেই ঘটনায় একটা স্পষ্ট মেসেজ পায় মাদক কারবারিরা, বিশেষ গতি আসে মাদক ব্যবসায়। সেই গতি যে দেশকে কোন দুর্গতির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে, তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) আয়োজিত একটি গবেষণায়। চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশিত এ গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এ গবেষণা সম্পন্ন হয়। গবেষণায় দেশের ৮টি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটকে মাদক হিসেবে বিবেচনায় না নিয়েও দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ অবৈধ মাদকে আসক্ত। মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, ব্যবহারকারীর বড় অংশ খুব অল্প বয়সে মাদকের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সেই প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। আর ৫৯ শতাংশের শুরু ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব। সঙ্গে প্রয়োজন ইশরাক হোসেনের মতো কিছু মানুষ। যাদের আপাতদৃষ্টিতে স্বল্পবোধ সম্পন্ন মনে হতে পারে। এত কিছুর পরও, কোনোই সন্দেহ নেই, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন সিনেমা স্টাইলে অস্ত্র প্রদর্শন করে অ্যাকশনে নেমে মোটেই ভালো কাজ করেননি, সাধারণ বিবেচনায় খারাপ কাজ করেছেন ইশরাক। কিন্তু তাই বলে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো তার মন্ত্রিত্ব চলে যাওয়া নিয়ে নানান প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে। আর যে কাজ প্রতিমন্ত্রীর করার কথা নয়, সেই কাজ করার জন্য তো পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ছিল এবং আছে; তারা কী করেছে? সহজেই বোধগম্য, বখরা নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেননি। কিন্তু তাদের কাউকে তো সরানো হয়নি। কেবল সরানো নয়, তাদের তো জেলে নেওয়া উচিত। কিন্তু এ উচিত কাজটিই তো এখনো হয়নি। আর হবে কি না, তাও বলা কঠিন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বালখিল্য আচরণে প্রতিমন্ত্রীর বিদায়ের ফলে মাদক কারবারিদের কাছে কী মেসেজ গেল? এটি অনেককে ভাবাচ্ছে! আরও ভাবনার বিষয় হচ্ছে, পুলিশের বক্তব্য নিয়ে। ইশরাকের ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ বলেছিল, নিয়ম বা আইন ভঙ্গ করেছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। বিশেষ করে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আইন লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম ১৮ অক্টোবর জানান, আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ও তার সহযোগীদের মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে ডিএমপির ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তে আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবচন আছে, ‘অসময়ে বর্ষাকাল, হরিণে চাটে বাঘের গাল!’ যে পুলিশ মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে না অথবা পারে না, তারা মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘যথাযথ’ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আওয়াজ দেয়। এ যেন ল্যাংড়ার পাড়ার ডিঙানোর খায়েশ। অবশ্য পুলিশের এসব বাকোয়াজ কথাবার্তায় মানুষের তেমন আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। আর পুলিশ কী পারে আর পারে না, সে বিষয়ে দেশবাসীর বিস্তর জ্ঞান আছে। পুলিশ প্রসঙ্গ থাক।
আসা যাক ইশরাক প্রসঙ্গ। মাদকবিরোধী অভিযানে সাধারণ দৃষ্টিতে সীমালঙ্ঘনের কারণে ইশরাককে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে বলে ১৮ অক্টোবর রাতেই খবর ছড়িয়ে পড়ে। যদিও বিষয়টি তিনি প্রথমে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছিলেন। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি বিষয়টি স্বীকার করে নিয়েছেন। এবং ১৯ অক্টোবর দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত বক্তব্য তুলে ধরেছেন। পদত্যাগের জন্য আহূত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে আজকের দিন থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি। পুরো সময়টা ঢাকা-৬ আসন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় মাদক নির্মূল ও অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দিয়েছেন।’ ইশরাক বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি পদত্যাগ করতে চাই। আমার জন্য যেন কাউকে বিব্রত হতে না হয়।’
মনে রাখা প্রয়োজন, মাদকবিরোধী অভিযানের সময় ইশরাক হোসেনের অগ্রহণযোগ্য অ্যাকশনের সময় মাদকের যে খণ্ডচিত্র ফুটে উঠেছে, তা হচ্ছে দেশেরই প্রতিচ্ছবি, যা দেশ-জাতির জন্য জন্য ভয়ংকর। এ অবস্থায় শেষ কথা হচ্ছে, ইশরাক হোসেন যেন তার কথা রাখেন। তিনি বলেছেন, ‘এবার সংসদ সদস্য বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নয়, একজন বিএনপিকর্মী হিসেবে মাদকের বিরুদ্ধে শতগুণ বেশি উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করব, ইনশাআল্লাহ। পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি আরও জোরদার হবে।’ আর আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশে যেন অসংখ্য ইশরাক হোসেন তৈরি হয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেন ইশরাকদের সঙ্গে থাকেন। যে কেউ বুঝবেন, প্রধানমন্ত্রী পাশে না থাকলে দেশকে মাদকের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, আমরা যেমন দেশের পানির সর্বনাশ করে ফেলেছি, তেমনই মাদক আমাদের সর্বনাশ করে ফেলছে, ফেলেছে!
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত, ২২ অক্টোবর ২০২।
শিরোনাম, ‘মাদক কারবারিদের আগ্রাসনে সর্বনাশের পদধ্বনি’