নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে দায়িত্ব পালনরত বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কনস্টেবল বশির আহমেদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অনৈতিক সুবিধা আদায়, প্রভাব বিস্তার এবং হাসপাতালের এক স্টাফকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে একই হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের সুযোগে তিনি বিভিন্ন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে নিয়মিত অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানির মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের কাছ থেকে মাসিক ভিত্তিতে এবং হাসপাতালের ভেতর ও আশপাশের বিভিন্ন দোকান থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ‘মাশোয়ারা’ আদায় করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের সামনের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মার্কেটিং কর্মীদের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় দুই বছর ধরে শেবাচিম হাসপাতালে পুলিশি দায়িত্ব পালন করছেন কনস্টেবল বশির। অভিযোগ রয়েছে, হাতে ওয়াকিটকি নিয়ে তিনি অনেকটা উপপরিদর্শকের (এসআই) মতো প্রভাব বিস্তার করে চলাফেরা করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের বিভিন্ন কাজে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সহযোগিতা করার মাধ্যমে তিনি সেখানে একটি নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরি করেছেন।
স্টাফকে মারধরের অভিযোগ
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) হাসপাতালের এক স্টাফকে মারধরের অভিযোগ ওঠে কনস্টেবল বশিরের বিরুদ্ধে। হাসপাতালের ভেতরে এক ব্যক্তিকে চুরির অভিযোগে হাতেনাতে আটক করার পর ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় বশির ওই স্টাফকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।
ওই স্টাফের দাবি, হাসপাতালকেন্দ্রিক একটি চক্রের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ নেওয়া হয়। এ কারণে ঘটনার ভিডিও ধারণ করায় কনস্টেবল বশির ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে মারধর করেন।
ওষুধ প্রতিনিধির কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
সম্প্রতি এক ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানির প্রতিনিধির কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে ২ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে কনস্টেবল বশিরের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, ছবি তোলার অভিযোগ তুলে বশির তার মোবাইল ফোন নিয়ে যান। পরে তাকে গালিগালাজ করে ২ হাজার টাকা দাবি করা হয়।
ওই প্রতিনিধি বলেন, “আমি কোনো ছবি তুলিনি। নিরুপায় হয়ে তাকে ২ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। অথচ আমার সামনেই কয়েকজন প্রকাশ্যে ছবি তুলছিলেন। তাদের কাউকে কিছু বলা হয়নি।”
তার অভিযোগ, যারা নিয়মিত অর্থ দেন, তাদের ক্ষেত্রে বশির ভিন্ন আচরণ করেন।
আরেক ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধির অভিযোগ, তার ওষুধের স্যাম্পল আটকে রেখে কনস্টেবল বশির তার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা আদায় করেছেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার মোবাইল ফোন আছড়ে ভেঙে দেওয়ারও অভিযোগ করেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওই বিক্রয় প্রতিনিধি বলেন, “এই ওষুধে আমার কতটুকু ব্যবসা হবে? অথচ আমার কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।”
এ ছাড়া ‘লাবু’ নামে আরও এক ওষুধ বিক্রয় প্রতিনিধির কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
হকারদের কাছ থেকেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালের ভেতরে প্রতিদিন আসা ভ্রাম্যমাণ হকারদের কাছ থেকেও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। বিনিময়ে তাদের হাসপাতালের অভ্যন্তরে পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, দালাল ও চোরচক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধেও কনস্টেবল বশিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
তাদের দাবি, কনস্টেবল বশিরের সঙ্গে নিয়মিত লেনদেন থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতালের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পান।
বদলি ঠেকানোর অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএমপির রিজার্ভ ইন্সপেক্টর (আরআই) ও সংশ্লিষ্টদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে বশির শেবাচিম হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করছেন—এমন অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি তাকে বরিশাল এয়ারপোর্ট থানায় বদলির আদেশ দেওয়া হলেও বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে সেই বদলি ঠেকিয়ে তিনি শেবাচিম হাসপাতালেই বহাল রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার কনস্টেবল বশিরের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কনস্টেবল বশির আহমেদ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি কারও কাছ থেকে টাকা নিই না। এসব অভিযোগ সবই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। একজন স্টাফের সঙ্গে কথাকাটাকাটি হয়েছে, তবে তাকে মারধর করিনি।”
আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ
এদিকে কনস্টেবল বশিরের কথিত কর্মকাণ্ডে হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা কিছু আনসার সদস্যেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ ও আনসার সদস্যরা মিলে মাসিক ‘মাশোয়ারা’ ভাগ করে নেন বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আনসার কমান্ডার (পিসি) নাগর বলেন, এসব অপকর্মের বিষয়ে তার কিছু জানা নেই। তিনি বলেন, “অপকর্ম করতে যাদের বাধা দিই, তারা ক্ষুব্ধ হয়ে এ ধরনের অভিযোগ করতে পারে।”
তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিএমপি কমিশনারের
শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মাহমুদ হাসান বলেন, অভিযোগগুলো তিনি শুনেছেন। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশ কমিশনারের অধীন হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষের।
বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) কমিশনার আবু রায়হান সালেহ বলেন, বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। শেবাচিম হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এর আগে এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাদের জানায়নি। তবে বর্তমানে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হাসপাতালের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনরত একজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।