• ৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সফল মানুষের করুণ পরিণতি, সিনেমার কাহিনীকেও হারমানায়

দখিনের সময়
প্রকাশিত জানুয়ারি ১, ২০২৬, ১২:৫৩ অপরাহ্ণ
সফল মানুষের করুণ পরিণতি, সিনেমার কাহিনীকেও হারমানায়
দখিনের সময় রিপোর্ট
সিনেমার কাহিনির মতো এমএ খালেকের জীবন। দেহরক্ষীবেষ্টিত হয়ে দামি গাড়িতে চলাফেরা করতেন। পরতেন বিশ্বখ্যাত নামি-দামি ব্র্যান্ডের স্যুট-জুতা। রাজধানীর অভিজাত গুলশান-বারিধারায় বেশ কয়েকটি বিলাসবহুল বাড়ি ছিল। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় অর্থ আত্মসাতের মামলায় কারাগারে থাকা এমএ খালেকের শেষ জীবন ছিল নিঃসঙ্গ, এমনকি পরিবার থেকে দূরে থাকা অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয়েছে।
গত এক দশকে প্রায় ১০টি কোম্পানি ও ব্যাংক এমএ খালেকের বিরুদ্ধে অন্তত ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ এনে মামলা করেছে। মামলা মাথায় নিয়ে তিনি কানাডায় স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন। সেখানে তার স্ত্রীসহ সন্তানরা বসবাস করেন। কিন্তু তিনি কানাডা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। দেশে তার বাড়ি-গাড়িসহ প্রায় সব সম্পদই বাজেয়াপ্ত বা জব্দ হয়েছে। জীবনের শেষ দিনগুলোয় একেবারে নিঃসঙ্গ জীবন কটেছে তার। শেষ পর্যন্ত কারাগারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে মারা গেছেন।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, তিনি গত ১৩ ডিসেম্বর রাতে মারা গেছেন। এরআগে, কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে ৬ ডিসেম্বর তাকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। স্ত্রী-সন্তান কানাডায় থাকায় কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এমএ খালেকের মরদেহ গ্রহণ করেন ভাতিজা কবির হোসেন। এরপর তাকে কোথায় সমাহিত করা হয়েছে, সে তথ্য চেষ্টা করেও জানা যায়নি। এমনকি দাপুটে উদ্যোক্তার মৃত্যু সংবাদ কোথাও আলোচনায়ও আসেনি।
দুদক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে এমএ খালেক ও তার পরিবারের সদস্যরা ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে ৩৭৬ কোটি, প্রাইম ফাইন্যান্স সিকিউরিটিজ থেকে ৩০৫ কোটি, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স থেকে ২০০ কোটি, পিএফআই প্রপার্টিজ থেকে ১৫০ কোটি, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে ১৬৭ কোটি, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ড থেকে ৫০ কোটি, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ থেকে ২০ কোটি ও পিএফআই ক্যাপিটাল থেকে ১৫ কোটি টাকা বের করে নিয়েছেন। এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানসহ নীতিনির্ধারণী বিভিন্ন পদে ছিলেন তিনি। এ ছাড়া, এমএ খালেকের মালিকানাধীন কোম্পানির নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে আরও প্রায় ৬০০ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হয়েছে। এসব ঋণের টাকাও ফেরত পায়নি সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।
এমএ খালেকের জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৩ মার্চ পিরোজপুর জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।  বহু প্রতিষ্ঠান গড়লেও কোনোটিতেই শেষ পর্যন্ত তিনি টিকে থাকতে পারেননি। অন্তত ১০টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। কোম্পানিগুলোর দায়েরকৃত মামলাসহ দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তৎপরতায় নিজের বাড়ি, গাড়িসহ বেশির ভাগ সম্পত্তি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তার একাধিক বাড়িসহ বেশকিছু সম্পত্তি জব্দও করেছে দুদকসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা। তবে অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তির বড় অংশ তিনি কানাডায় পাচার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। দেশটিতে তার একাধিক বাড়িসহ বিপুল সম্পত্তি রয়েছে। সেখানে তার স্ত্রী ও সন্তান স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
১৯৯৫ সালে এমএ খালেক বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংক পিএলসি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া তিনি প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্স ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, প্রাইম ইসলামী সিকিউরিটিজ লিমিটেড, প্রাইম প্রুডেনশিয়াল ফান্ড লিমিটেড, প্রাইম ফাইন্যান্সিয়াল সিকিউরিটিজ লিমিটেড, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, ফারইস্ট স্টক অ্যান্ড বন্ডস লিমিটেড ও পিএফআই সিকিউরিটিজ লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তাদের অন্যতম।
এ ছাড়া, গ্যাটকো লিমিটেড, গ্যাটকো অ্যাগ্রো ভিশন লিমিটেড, গ্যাটকো টেলিকমিউনিকেশনস লিমিটেড, ম্যাকসন্স বাংলাদেশ লিমিটেড, ম্যাকসন্স বে লিমিটেড, এইচআরসি টেকনোলজিস লিমিটেড, প্রাইম প্রপার্টি হোল্ডিংস লিমিটেড, পিএফআই প্রপার্টিজ লিমিটেডেরও মালিকানায় ছিলেন তিনি। ছিলেন বেসরকারি প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান পদেও। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি।
প্রয়াত এমএ খালেকের কর্মকাণ্ড খুব কাছ থেকে দেখেছেন বেসরকারি খাতের প্রাইম ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালকদের অন্যতম ও ইস্ট কোস্ট গ্রুপের কর্ণধার আজম জে চৌধুরী। তিনি বলেন, এমএ খালেক সংগঠক ছিলেন। তবে তার তেমন কোনো সম্পদ ছিল না। নানা খাতের উদ্যোক্তারা তাকে বিশ্বাস করতেন। এমনকি তারা অর্থ ধার দিয়ে মূলধনও জোগান দিয়েছেন। তিনি ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়সহ বহু কোম্পানি গড়ে তোলার নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, পুঁজির জোগানদাতা উদ্যোক্তাদের বিশ্বাস ও আস্থার মূল্য তিনি ধরে রাখতে পারেননি। আজম জে চৌধুরী আরও বলেন, এমএ খালেকের এ নির্মম পরিণতি থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়ার আছে বলেও মন্তব্য করেন আজম জে চৌধুরী।
আশির দশকে এমএ খালেক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা শুরু করেন। এক্ষেত্রে তার মূল পুঁজি ছিল মেধা ও পরিশ্রম। তিনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার নথিপত্র গোছানো থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতেন। ওই সময় তার মধ্যে কখনো প্রতারণার মনোভাব দেখা যায়নি। কিন্তু ২০১০ সাল-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই এমএ খালেকের মধ্যে পরিবর্তন দেখা যেতে শুরু করে তার ব্যবসায়িক অংশীদাররা।
আর ২০১৮ সাল-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়তে শুরু করে। এরপর কানাডায় পালিয়ে গিয়েও দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের নভেম্বরে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যান তিনি।
অনিয়ম-দুর্নীতি করে আর্জিত সম্পদ সবাই ভোগ করতে পারে না বলে মনে করে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, আমাদের প্রত্যেকের মনে রাখা দরকার যে তুমি যে-ই হও না কেন, মরণ আসবেই। অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতি বা চুরি করে সম্পদের পাহাড় গড়েন। কিন্তু জীবদ্দশায়ই সেই সম্পদ নাই হয়ে যায়। এমএ খালেকের মতো উদ্যোক্তার জীবন তার প্রমাণ। তিনি আরও বলেন, মৃত্যুর পর অনেক উদ্যোক্তাকে দেশের মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। কিন্তু যারা নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে কিংবা অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দ্রুত বড় হতে চান, তাদের পতনও দ্রুত হয়।