প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অপরাধের বিচারহীনতা বন্ধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও সহিংসতার ধরন পরিবর্তিত হলেও এসব অপরাধের বিচারে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বিশেষ করে নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অনলাইন হয়রানি, যৌন হুমকি, সাইবার স্টকিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ছবি বিকৃতির মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় কার্যকর প্রতিরোধ ও প্রতিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে বিএনএনআরসি।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা অবসানবিষয়ক আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক আহ্বানে সংস্থাটি বলেছে, রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত জেলার সাংবাদিকদের জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো সাংবাদিক প্রাণনাশের হুমকি বা হামলার শিকার হলে প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, দ্রুত প্রতিকার এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বিএনএনআরসির মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল তাঁদের পেশাগত অধিকার রক্ষার বিষয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের তথ্য জানার অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পৃক্ত। সাংবাদিকদের হুমকি উপেক্ষা করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয় এবং এর ফলে দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অনিয়মের তথ্য জনসমক্ষে আসার পথ সংকুচিত হয়।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারে ব্যর্থতার হার ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ২০১২ সালে এ পরিসংখ্যান শুরু হওয়ার পর এটিই প্রথম বৃদ্ধি। একই প্রতিবেদনে দুই বছরে ১৮৯ জন সাংবাদিক নিহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যাঁদের মধ্যে ১২৭ জন সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিহত হয়েছেন। সংস্থাটি স্পষ্ট করেছে, এই পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার চিত্র তুলে ধরে, এটি বাংলাদেশের একক পরিসংখ্যান নয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। এদিকে প্রযুক্তির ব্যবহার সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় ড্রোন হামলাসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আক্রমণে সাংবাদিকদের প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বিএনএনআরসি বলছে, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা শুধু হত্যাকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অপহরণ, নির্যাতন, অন্যায় আটক, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানিমূলক মামলার মাধ্যমেও তাঁদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। এসব ঘটনার বিচার না হলে সাংবাদিকদের মধ্যে ভীতি ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি হয়, যা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার দীর্ঘদিনেও সম্পন্ন না হওয়াকে বিচারহীনতার উদ্বেগজনক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। বিএনএনআরসি বলেছে, এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে এবং অনুমানের পরিবর্তে প্রমাণের ভিত্তিতে সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনাগুলোরও যথাযথ তদন্ত এবং বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নারী সাংবাদিকদের অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে বিএনএনআরসি। ইউনেস্কো ও ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্টসের (আইসিএফজে) ‘দ্য চিলিং’ প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, জরিপে অংশ নেওয়া নারী সাংবাদিকদের ৭৩ শতাংশ কর্মক্ষেত্রসংশ্লিষ্ট অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষায় যৌন হয়রানিমূলক মন্তব্য, সাইবার হয়রানি এবং ছবি বিকৃত করে অপপ্রচারের মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিএনএনআরসি বর্তমানে ‘স্ট্রেনদেনিং রেজিলিয়েন্স এগেইনস্ট টেকনোলজি ফ্যাসিলিটেটেড জেন্ডার বেইসড ভায়োলেন্স (টিএফজিবিভি) অ্যান্ড প্রমোটিং ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নাগরিকতা: সিভিক এনগেজমেন্ট ফান্ড (সিইএফ) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে অর্থায়ন করছে সুইজারল্যান্ড, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে জিএফএ কনসালটিং গ্রুপ।
প্রকল্পের প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে—হত্যাকাণ্ড, শারীরিক হামলা ও গুরুতর হুমকির নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা; জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত সাড়াদান ব্যবস্থা ও হেল্পলাইন চালু করা; সাংবাদিকতার কারণে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রদান।
এ ছাড়া নারী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার হামলা, যৌন হুমকি, ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ এবং এআই দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি ছড়িয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সাংবাদিক ও ফ্রিল্যান্সারদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
বিএনএনআরসি আরও বলেছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তায় একটি জাতীয় বাস্তবায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে হুমকি ও হামলার তদন্তের অগ্রগতি এবং বিচারিক কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়মিত জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে হবে, যাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়।
সাংবাদিকদের সুরক্ষায় জাতিসংঘের কর্মপরিকল্পনার (ইউএন প্ল্যান অব অ্যাকশন) কথা উল্লেখ করে সংস্থাটি জানায়, ২০১২ সালে গৃহীত এই পরিকল্পনায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিরোধ, সুরক্ষা ও বিচারিক জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গৃহীত এসব অঙ্গীকার বাংলাদেশেও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
বিএনএনআরসি বলেছে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে তাঁদের কর্মস্থল, ভৌগোলিক অবস্থান কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব বিবেচনা না করেই। জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধি, ফ্রিল্যান্সার, কমিউনিটি রেডিওর সাংবাদিক, নারী সাংবাদিক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবাদিকদের জন্যও সমান সুরক্ষা ও সহায়তার ব্যবস্থা থাকতে হবে।
সংস্থাটির মতে, একজন সাংবাদিক হুমকির মুখে পড়ার পর রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কি না, অভিযোগের তদন্ত কতদূর এগোচ্ছে এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে কি না—এসবের ওপরই সাংবাদিক সুরক্ষায় প্রকৃত অগ্রগতি নির্ভর করে। প্রতিটি জেলায় কার্যকর সাড়াদান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারহীনতা বন্ধ করা সম্ভব।