নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
পবিত্র কাবা শরিফের সামনে দাঁড় করিয়ে শপথ করিয়েছিলেন স্ত্রীকে। আশা ছিল, পবিত্র ভূমিতে দেওয়া সেই শপথে ফিরে আসবে দাম্পত্য জীবনের বিশ্বাস, অবসান হবে সম্পর্কের টানাপোড়েন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিশ্বাস আর ফিরে পাননি সৌদি আরবপ্রবাসী মো. মনির হোসেন চৌধুরী। এবার সাবেক স্ত্রী নাসরিন সুলতানা ও তাঁর কথিত প্রেমিক তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৪৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
অভিযোগের ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত শেষে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (পিবিআই) আদালতে দুজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। গত ২ নভেম্বর আদালতে হাজির হলে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। অভিযুক্ত দুজনই পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল ১১টায় বরিশাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নিজের দাম্পত্য জীবনের নানা ঘটনা, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এবং আইনি লড়াইয়ের বিস্তারিত তুলে ধরেন ভুক্তভোগী মনির হোসেন চৌধুরী।
লিখিত বক্তব্যে মনির জানান, ২০১২ সালের ৪ ডিসেম্বর নাসরিন সুলতানার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ে। ২০০২ সাল থেকে সৌদি আরবে কর্মরত তিনি। প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ নিয়মিত দেশে পাঠাতেন স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও সংসারের উন্নতির জন্য।
দীর্ঘদিনের দাম্পত্য বিশ্বাস থেকে নিজের উপার্জনের বড় অংশ স্ত্রীর কাছে পাঠিয়েছেন। এমনকি সাত লাখ টাকা ব্যয়ে ১৫৩ নম্বর বেগম শামসুন্নাহার শিশু কল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্ত্রীকে সহকারী শিক্ষক পদে চাকরির ব্যবস্থা করে দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে তাঁর অভিযোগ, চাকরিতে যোগদানের পর একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তারিকুল ইসলামের সঙ্গে নাসরিনের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে বরিশাল নগরীতে বাসা ভাড়া নিয়ে তাঁরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে বসবাসও করেন। বিষয়টি জানাজানি হলে তারিকুলকে ভোলায় বদলি করা হয়। কিন্তু তাতেও তাঁদের কথিত সম্পর্কের অবসান ঘটেনি।
দাম্পত্য সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে শেষ চেষ্টাও করেছিলেন মনির। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ মার্চ স্ত্রীকে সৌদি আরবে নিয়ে ওমরা পালন করান। পবিত্র কাবা শরিফের সামনে দাঁড় করিয়ে স্ত্রীকে কথিত পরকীয়া সম্পর্ক থেকে সরে আসার শপথও করান। কিন্তু এত কিছুর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে মনির আরও অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের ১৬ জুন সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার সময় ১১ ভরি ওজনের একটি স্বর্ণের বার নিয়ে আসেন তিনি। সে সময় স্বর্ণের বারটির বাজারমূল্য ছিল ২৮ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা।
স্ত্রীর পরামর্শে ছেলে-মেয়ের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তাঁদের নামে জমি কেনার উদ্দেশ্যে স্বর্ণের বারটি বিক্রি করতে সম্মতি দেন। কিন্তু সন্তানদের নামে জমি না কিনে স্ত্রী ও তাঁর ভাইয়ের নামে জমি কেনা হয়। জমির দলিলে মূল্য পাঁচ লাখ টাকা দেখিয়ে অবশিষ্ট অর্থ আত্মসাৎ করেন।
এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্ত্রীর ব্যাংক হিসাবে পাঠানো অর্থ, বাসাভাড়া বাবদ দেওয়া টাকা এবং ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর নগদ ১৫ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ টাকা দিয়ে স্বর্ণালংকার কিনে দেওয়ার বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরেন তিনি।
মনিরের দাবি, তারিকুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক স্ত্রীর কথিত সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাঁদের সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি নাসরিন নগদ এক লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকার নিয়ে বাবার বাড়িতে চলে যান। একই দিন তাঁকে তালাকের নোটিশ পাঠানো হয় বলেও জানান তিনি।
মনিরের অভিযোগ, সাবেক স্ত্রী নাসরিন সুলতানা ও তারিকুল ইসলামের যোগসাজশে তাঁর মোট ৪৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেন। পাশাপাশি স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য সম্পদেরও কোনো সুষ্ঠু হিসাব তাঁকে বুঝিয়ে দেয়নি।
অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে আদালতে মামলা করেন মনির হোসেন। পরে আদালত মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেন পিবিআইকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ১৪ সেপ্টেম্বর পিবিআইয়ের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. রহিম অভিযুক্ত নাসরিন সুলতানা ও তারিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর বরিশাল সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে হাজির হলে বিচারক তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত মনির হোসেন বলেন, প্রবাসে জীবনের দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ ও সম্পদ গড়ে তুলেছেন, তার সঠিক হিসাব ও ন্যায্য অধিকার তিনি ফিরে পেতে চান। একই সঙ্গে দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন কোনোভাবেই অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
নিজের কষ্টার্জিত অর্থ ও সম্পদের সুষ্ঠু হিসাব, অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার এবং দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ ও অধিকার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও বিচার বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন এই প্রবাসী।