দখিনের সময় ডেস্ক:
বলিউড স্টার অভিনেতা নানা পটেকরের ৭৫ বছর বয়সে আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার(৮ অক্টোবর) ভোরে গোয়ার বাড়িতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন তিনি। সংজ্ঞা হারান। চিকিৎসকদের অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো যায়নি। নানার দেহ ময়নাতদন্তের জন্য গোয়া মেডিক্যাল কলেজে পাঠানো হয়। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় একটি চিকিৎসা সংক্রান্ত আইনি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। নানার অবদানের কথা মাথায় রেখে তাঁর শেষকৃত্য পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মহারাষ্ট্র সরকার।
নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় এক মধ্যবিত্ত মরাঠি পরিবারে তাঁর জন্ম। নানার শৈশব কেটেছে প্রতিকূলতা এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। নানা পটেকরের জীবনকাহিনি কেবল একজন বলিউড তারকার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। রুপালি পর্দায় রাজত্ব করার অনেক আগে থেকেই তাঁকে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। পেতেন ৩৫ টাকা, পোস্টার আঁকতে হাঁটতেন ১৬ কিমি!
নানার আসল নাম বিশ্বনাথ পটেকর। ১৯৫১ সালের ১ জানুয়ারি মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ-জঞ্জিরায় এক মধ্যবিত্ত মরাঠি পরিবারে তাঁর জন্ম। নানার শৈশব কেটেছে প্রতিকূলতা এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ২০২৪ সালে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন, মাত্র ১৩ বছর বয়স থেকে তিনি আয় করা শুরু করেছিলেন। সত্তরের দশকের শেষের দিকে বলিপাড়ায় আত্মপ্রকাশ করেন নানা। আশি থেকে নব্বইয়ের দশকে বলিপাড়ায় জনপ্রিয় অভিনেতাদের তালিকায় প্রথম সারিতে জায়গা করে নেন তিনি। কিন্তু অভিনেতা তাঁর জীবনে এমন সময়ও কাটিয়েছিলেন যখন তিনি ৩৫ টাকা উপার্জনের জন্য আট কিলোমিটার হেঁটে যেতেন। কাজের বদলে এক বেলা পেট পুরে খাওয়ার সুযোগও খুঁজতেন।
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবিতে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে কেরিয়ার শুরু করেন নানা। ‘সালাম বম্বে’, ‘অঙ্গার’, ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’-এর মতো ছবি দর্শককে উপহার দিয়েছেন তিনি। কেরিয়ারে সাফল্যের স্বাদ পেলেও শৈশবে কঠিন সময় পার করেছেন নানা। ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অভিনেতার বাবা। কিন্তু সেই ব্যবসা লোকসানের মুখ দেখে।
নানার বাবা তাঁর বন্ধুর সঙ্গে যৌথ ভাবে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। সেই বন্ধুই টাকাপয়সা নয়ছয় করেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। নানার বাবার ব্যবসায় ভরাডুবি হওয়ায় তাঁদের সংসারেও অর্থাভাব দেখা দেয়। স্কুলে পড়ার সময় সংসার খরচের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে কিশোর নানার উপরেও। শোনা যায়, প্রতি দিন স্কুল থেকে ফিরে আবার কাজ করতে যেতেন নানা। সামান্য কিছু অর্থপ্রাপ্তির আশায় জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছেন তিনি। সিনেমার পোস্টারও বানাতেন নানা। স্কুল থেকে ফিরে আট কিলোমিটার হেঁটে পোস্টার বানাতে যেতেন তিনি। এই ভাবে প্রতি দিন ৩৫ টাকা রোজগার করতেন অভিনেতা।
সাক্ষাৎকারে নানা বলেছিলেন, ‘‘সংগ্রামের সঙ্গে আমার পরিচয় শৈশবেই ঘটেছিল। সে সময় আমার পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না এবং মায়ের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে, আমাকে মা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। ১৩ বছর বয়সে আমি প্রথম চাকরি করা শুরু করি। এর জন্য আমাকে বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যেতে ও আসতে হত। এ ভাবেই প্রতিদিন আমি ১৬ কিলোমিটার পথ হেঁটে যাতায়াত করতাম। এর বিনিময়ে আমি পেতাম মাত্র ৩৫ টাকা। আমার কাজের কথা শুনলে আপনারা অবাক হবেন। আমি সিনেমার পোস্টার আঁকার কাজ করতাম।’’
পোস্টার তৈরির জন্য টাকার পাশাপাশি এক বেলার খাবারও বিনামূল্যে পেতেন নানা। খাবার নিয়ে আবার আট কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরে যেতেন অভিনেতা। এ ভাবেই নানা তাঁর শৈশবের সংগ্রামের কথা অকপটে তুলে ধরেছিলেন।
২৭ বছর বয়সে বিয়ে করেন নানা। সেই বছরেই বলিউডে নানার প্রথম ছবি মুক্তি পায়। নতুন পেশা এবং সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নানা। নানার যখন ২৮ বছর তখন তাঁর বাবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। পরে প্রথম পুত্রসন্তান দুর্বাসাকেও হারান। ১৯৯১ সালে নানার ছবি ‘প্রহার’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। এই ছবির মাধ্যমে পরিচালনায় হাতেখড়ি হয় নানার। পরিচালনার পাশাপাশি এই ছবিতে অভিনয়ও করেন তিনি।
বলিপাড়া সূত্রে খবর, ‘প্রহার’ ছবির জন্য তিন বছর সেনাবাহিনীতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন নানা। সেনা থেকে তাঁকে ‘ক্যাপ্টেন’ পদমর্যাদা দেওয়া হয়। জেনারেল বিজয়কুমার সিংহের সঙ্গে কাজ করেছিলেন নানা। ‘প্রহার’ ছবিতে বিজয়কুমারও ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। শুধুমাত্র নিজের ছবির প্রয়োজনে যে সেনাবাহিনীতে নানা প্রশিক্ষণ নেননি তার প্রমাণ দিয়েছিলেন অভিনেতা। ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পর নানা আবার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং কার্গিল যু্দ্েধর সময় দেশের সেবায় নিযুক্ত হন। বলিপাড়ার একাংশের অনুমান, দীর্ঘ সময় সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলেই নানার হাবভাব গুরুগম্ভীর প্রকৃতির। নিয়মনিষ্ঠা মেনে চলার নেপথ্যকারণও একই বলে মনে করেন অনেকে।
শোনা যায়, ১৯৭৮ সাল থেকে নানা যা উপার্জন করেছেন তার অনেকটাই গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি। অনেক সময় এমনও হয়েছে, ফিল্মে কাজ করার পুরো পারিশ্রমিকটাই কোনও এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে দিয়ে দিয়েছেন। ২০১৫ সালে নানা একটি সংস্থা গড়ে তোলেন। মহারাষ্ট্রের খরা কবলিত এলাকায় কাজ করে তাঁর অসরকারি সংস্থা। ২০১৫ সালে বিদর্ভ, লাতুর অঞ্চলের ১৭৫টি চাষি পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে চেকও দিয়েছিলেন অভিনেতা। বন্যা কবলিত এলাকার মানুষের জন্য মহারাষ্ট্রে ৫০০টি ঘর তৈরি করার কথাও ঘোষণা করেছিলেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে নানা জানিয়েছিলেন যে, তাঁর মা সোনা খুব পছন্দ করতেন। এর ফলে তাঁর মধ্যেও এর প্রতি এক ধরনের অনুরাগ গড়ে ওঠে এবং প্রতিটি সিনেমার আয় থেকে তিনি তাঁর মায়ের জন্য সোনা কিনতেন। নানার কেরিয়ারের শুরুর দিনগুলো নিঃসন্দেহে ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং সংগ্রামে ভরা। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি ৮০ কোটি টাকারও বেশি সম্পত্তি রেখে গিয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে যে, সংগ্রাম থেকে খ্যাতির শিখরে পৌঁছোনোর নানার এই যাত্রা ছিল সত্যিই অসাধারণ।