ঘটনাটি ২০০০ সালের। তখন আমি দৈনিক আল আমিনের ক্রাইম রিপোর্টার। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেসময় যে কয়জন সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টারের স্নেহ ও ভালোবাসা পেয়েছি, তাদের মধ্যে আমিনুর রহমান তাজ ভাই অন্যতম। কাজী শাহেদ আহমেদ সম্পাদিত দৈনিক আজকের কাগজের চিফ ক্রাইম রিপোর্টার ছিলেন তাজ ভাই। অত্যন্ত হেল্পফুল পারসন। ক্ষুরধারসম্পন্ন রিপোর্টিং ছিল তাজ ভাইয়ের।
হঠাৎ একদিন আজকের কাগজে লিড নিউজ হিসেবে একটি খবর প্রকাশ করলেন তাজ ভাই। শিরোনাম ছিল ‘পুলিশে দুই বান্ধবীর ৪ কোটি টাকার মিশন’। দুই বান্ধবীর একজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর স্ত্রী, আরেকজন পুলিশ কমিশনারের। তারা পুলিশের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাজ ভাইয়ের লিড নিউজে তার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরা হয়।
ওই নিউজ প্রকাশ হওয়ার পর হইচই পড়ে যায় পুলিশ বিভাগে। প্রতিবেদনের কারণে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ঢাকার পুলিশ কমিশনার। রিপোর্ট যেদিন প্রকাশ হয়, সেদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন লন্ডনে। সেখান থেকেই তিনি ফোন করেন আজকের কাগজের সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদকে। বলেন, ‘কে এই রিপোর্টার, কী তার পরিচয়? ওই কুত্তার বাচ্চাকে আমি দেখে নেব।’ মন্ত্রীর এই হুমকিতে সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ সরাসরি রিপোর্টার তাজ ভাইয়ের পক্ষ নিলেন। আর মন্ত্রীর হুমকির তীব্র প্রতিবাদ করলেন লেখনীর মাধ্যমে।
আজকের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় তিন কলামে কাজী শাহেদ আহমেদ একটি বিশেষ লেখা প্রকাশ করলেন। লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘লন্ডন থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন, ওই কুত্তার বাচ্চাকে আমি দেখে নেবো’। কাজী শাহেদ আহমেদের এই লেখাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ কমিশনার আরও ক্ষুব্ধ হলেন।
এক দিন আমার কাছে খবর এল, তাজ ভাইকে গ্রেপ্তার করা হবে। বিষয়টি তাজ ভাইকেও জানালাম। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই চলে যেতাম তাজ ভাইয়ের এজিবি কলোনির বাসায়। সেখানে সকালের নাস্তা সেরে আমি আর সত্যেন বিশ্বাস দাদা তাজ ভাইয়ের সঙ্গে বের হতাম। কোনো কোনো দিন আসতেন ক্রাইম রিপোর্টার জয়নাল। কিন্তু যেদিন তাজ ভাইকে গ্রেপ্তার করা হলো, সেদিন অন্য কাজে ব্যস্ততার কারণে আর তাজ ভাইয়ের সঙ্গে যাওয়া হয়নি।
৩৬ মিন্টো রোড ডিবি অফিসে বাইরে পিআর শাখায় আসা মাত্র সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার সাকির আহমেদ ভাই জানালেন, তাজ ভাইকে গ্রেপ্তারের খবর। মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। জানলাম, তৎকালীন এসি পিআর মোর্শেদ ভাইকে (বিসিএস-১৫ ব্যাচের) দিয়ে ডিবি অফিসে ডেকে নিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে তাকে রমনা থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে ছুটলাম রমনা থানায়। এ খবর ক্রাইম রিপোর্টারদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে সবাই ছুটে আসেন থানায়। এরপর থানা ঘেরাও করে আমরা গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানাই। ইতোমধ্যে গ্রেপ্তারের খবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কানে যাওয়া মাত্র তিনি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ডেকে পাঠালেন। নিজের ক্ষোভের কথাও জানান।
ওই দিন দুপুরের পর রমনা থানা থেকে তাজ ভাইকে আদালতে নেওয়া হয়। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এবং মুক্তির দাবিতে আমরা ক্রাইম রিপোর্টাররা প্রেসক্লাবের সামনের সড়ক অবরোধ করলাম। পরে আমাদের কাছে খবর এল পুলিশ কমিশনার আদালতে হাজির হয়ে তাজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। কিন্তু বেশিক্ষণ তাজ ভাইকে আদালতে থাকতে হয়নি। এজলাসে তোলার কিছুক্ষণ পর বিচারক তাজ ভাইকে জামিনে মুক্তি দেন। ফুলের মালা গলায় দিয়ে আদালত থেকে সরাসরি তাজ ভাইকে প্রেসক্লাবে আনা হয়। ওই দিনই ছিল ঢাকায় কর্মরত ক্রাইম রিপোর্টারদের সবচেয়ে ঐক্যবদ্ধ এবং দুর্বার আন্দোলন।
আজকের পত্রিকায় রিপোর্টটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে মুক্তি পর্যন্ত আজকের কাগজের সম্পাদক কাজী শাহেদ আহমেদ ছিলেন তাজ ভাইয়ের পাশে। নিজে কলমও ধরেন রিপোর্টারের পক্ষে। গত রাতে এই সাহসী সম্পাদক মারা গেছেন। তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
শাহজাহান আকন্দ শুভ: চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আমাদের সময়