• ১লা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৭ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপিতে ফজলুর রহমানের সব পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত

দখিনের সময়
প্রকাশিত আগস্ট ২৬, ২০২৫, ২১:২৪ অপরাহ্ণ
বিএনপিতে ফজলুর রহমানের সব পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত
দখিনর সময় ডেস্ক:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের অভিযোগে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ তিন মাসের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিএনপির একটি সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
গত ২৪ আগস্ট ২০২৫ (সূত্র নং-বিএনপি/সাধারণ/৭৭/১৪৭/২০২৫) তারিখে ফজলুর রহমানের নামে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। তিনি ওই নোটিশের লিখিত জবাব না দিয়ে সময় বৃদ্ধির আবেদন করেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৫ আগস্ট (সূত্র নং-বিএনপি/সাধারণ/৭৭/১৪৮/২০২৫) তারিখে ২৪ ঘণ্টার সময় বাড়ানো হয়। আজ মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) তিনি যে লিখিত জবাব দিয়েছেন, তা ‘অসন্তোষজনক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে দলীয় সিদ্ধান্তে বলা হয়, ‘তথাপিও, বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে আপনার অবদান বিবেচনায় নিয়ে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে আপনার দলীয় প্রাথমিক সদস্য পদসহ সব পর্যায়ের পদ তিন মাসের জন্য নির্দেশক্রমে স্থগিত করা হলো।’ সিদ্ধান্তে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘এখন থেকে আপনি টকশো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কথা বলার সময় দেশের মর্যাদা ও দলের নীতিমালা যাতে ক্ষুণ্ন না হয় এবং দেশের জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে যাতে আঘাত না লাগে সে বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকবেন।’
শোকজের জবাবে যা
বললেন  ফজলুর রহমান
গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ক্রমাগত বিতর্কিত মন্তব্য করার অভিযোগ তুলে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে রোববার (২৪ আগস্ট) কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দেয় দলটি। ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে অবশেষে সেই শোকজের জবাব দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার (২৬ আগস্ট) বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বরাবর জমা দেওয়া এ শোকজের জবাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান।
জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে কেন তিনি ক্রমাগত কুরুচিপূর্ণ এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দিচ্ছেন, কারণ দর্শানোর নোটিশে এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির এ নেতা লিখেছেন, অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে এই অভিযোগটি অস্বীকার করে আমি বলতে চাই আমি কোনদিন কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেই নাই, যা আমার স্বভাব ও চরিত্রের বিপরীতে। আমিই প্রথম ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবু সাইদকে পুলিশ সরাসরি বুকে গুলি করে হত্যা করার পর বলেছিলাম সে এই একুশ শতাব্দীর প্রথম ‘বীরশ্রেষ্ট’। আমার বক্তব্যে জুলাই-আগস্ট শহীদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানিয়ে আসছি। তিনি লেখেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে আমি নাকি জনগনের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে কথা বলেছি যা আমার দৃঢ় ধর্ম বিশ্বাসের প্রতি অবিচার। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই আমি ইসলাম ধর্ম এবং আল্লাহ রাসুলে বিশ্বাসী ব্যক্তি। তবে, রাজনৈতিকভাবে ধর্ম ব্যবসায়ীদের (যেমন জামায়াতে ইসলামী) বিরুদ্ধে চিরদিন কথা বলেছি, আগামীতেও বলবো।
শোকজের জবাবে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান আরও লিখেছেন, দলের নেতৃবৃন্দের সুবিবেচনার স্বার্থে আমি নিম্নলিখিত বক্তব্যগুলো পেশ করতে চাই। কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রথম শুরু হয়েছিল, তা ছিল নির্দলীয় চরিত্রের এবং রাজনৈতিক দাবি বিবর্জিত। আমিই প্রথম তাদেরকে ইউটিউবের মাধ্যমে উৎসাহ দিয়ে বক্তব্য দিয়েছিলাম, ‘বাবারা তোমরা শুধু চাকুরি চাও, গণতন্ত্র চাও না?  তোমরা গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করো।’ জুলাই আন্দোলনের পরতে পরতে সমস্ত কিছুর সঙ্গে জীবনের শঙ্কা নিয়েও যুক্ত ছিলাম, যা আমার দল এবং এ দেশের সমস্ত মানুষ জানে।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির ডাকা লাখ লাখ জনতার মহাসমাবেশকে স্বৈরাচারী সরকার ১ ঘণ্টার আক্রমণে ভেঙে দিয়েছিল। ২৫ হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী যখন জেলে ছিল, লাখ লাখ নেতাকর্মী যখন মিথ্যা মামলার আবর্তে পড়ে জীবন বাঁচানোর জন্য প্রানপণ চেষ্টা করছিল, জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি তখন প্রতিদিন অনলাইন এবং টেলিভিশন টকশোর মাধ্যমে নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছি এবং জাতির সামনে আশার আলো জাগিয়ে রেখেছি।
৫ আগস্ট আন্দোলনের বিজয়ের মাধ্যমে যখন শেখ হাসিনাসহ ফ্যাসিস্ট শক্তি পালিয়ে গেল এবং জনগণ বিজয়ী হলো, আমি সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু, এর কিছুদিন পরেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা সারজিস আলম ‘ইসলামী ছাত্র শিবিরের’ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সম্মেলনে দাড়িয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলো ‘জামায়াত-শিবিরই ছিল জুলাই আন্দোলনের মূল ভ্যানগার্ড’। আমি সেদিনই প্রমাদ গুনলাম এবং আন্দোলনের সমস্ত বিজয়কে তারা নিজেদের মধ্যে কুক্ষিগত করলো।
আমি জামায়াত-শিবির ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের এই অনৈতিক দাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শতবার বলেছি, বিগত ১৫ বছরের আন্দোলনে জমিটি তৈরি করেছিল বিএনপি; বীজ এবং চারা রোপন করেছিল বিএনপি, তেল-মবিল, পানি দিয়ে ধান ফলিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু ধান কাটার লগ্নে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা সেই ধান কেটে দিয়েছিল। তারা ছিল আমার ভাষায় ‘দাওয়াল’, কাজেই আন্দোলনের সমস্ত ফসল পাওয়ার দাবিটি অনুচিত। কিন্তু, পরবর্তী সময়ে অবাক বিস্ময়ে সবাই দেখলো, একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবির স্বদর্পে মাঠে হাজির হয়েছে এবং দাবি করছে সমস্ত আন্দোলনের ভ্যানগার্ড তারাই এবং শুধু একটা নির্বাচনের জন্যই তারা আন্দোলন করেনি; বরং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকারের মতো দুঃসাহস তারা প্রদর্শন করতে লাগলো। জামায়াত-শিবিরের পত্রিকায় আহ্বান জানানো হলো, ‘একাত্তরে যারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছিল, তারা আল্লাহর কাছে মাফ চাও’। (সূত্র: বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা)
সেদিন থেকে বিভিন্ন বক্তব্যের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাদেরকে সাবধান করার চেষ্টা করেছি। এরপর থেকে জামায়াত-শিবির এবং এনসিপি একসঙ্গে বলতে শুরু করলো, ১৯৪৭ হলো প্রথম স্বাধীনতা এবং ২০২৪ হলো দ্বিতীয় স্বাধীনতা, আর ১৯৭১ হলো ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া (সূত্র: বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা)।
মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে হলো, এসব অশ্রাব্য এবং মিথ্যা তথ্য শোনার আগে আমার মৃত্যু হওয়া উচিত ছিল। তাই জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের সত্য কথাগুলো বলতে শুরু করলাম এবং জামায়াত-শিবিরকে ‘কালো শক্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করে এনসিপিকে তাদের সহযোগী বলতে শুরু করলাম। তারাই এখন দেশের সমস্ত প্রশাসন, অর্থ এবং বিশ্ববিদ্যালয় দখল করেছে।
আমি সবশেষে বলতে চাই, মানুষ এখন বুঝতে শুরু করেছে জুলাই আন্দোলনের দুটি রূপ ছিল। প্রথমতো ‘বিএনপিসহ জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতৃত্বে’  ‘গণ-আন্দোলন’  যার লক্ষ্য ছিল ফ্যাসিবাদী হাসিনা সরকারকে পরাজিত করে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করা। যার প্রধান স্লোগান ছিল ‘এক দফা এক দাবি, হাসিনা তুই কবে যাবি’। কিন্তু আমি যাদেরকে অন্ধকারের ‘কালো শক্তি’ বলেছি, তারা হলো জামায়াত-শিবির, যারা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে গণ-আন্দোলনের ফসলকে কুক্ষিগত করে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে নতুন ষড়যন্ত্র এবং শক্তি সৃষ্টি করছে। জাতীয় নির্বাচন তাদের নিকট গৌণ ব্যাপার।
শোকজের জবাবে লেখা চিঠিতে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান আরও লেখেন, আমার প্রিয় দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযুদ্ধের মহান ঘোষক ‘মেজর জিয়া’ পরবর্তী সময়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দেশের সবচাইতে বৃহৎ রাজনৈতিক দল। তার মহান স্মৃতিকে শ্রদ্ধা এবং স্মরণ করেই আমি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরন্তর কথা বলা এবং প্রতিবাদ করাকে আমার পবিত্র দ্বায়িত্ব বলে মনে করি। গত ৬ মাস ধরে এ ব্যাপারে আমি শত শত বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছি। এর মধ্যে দু-একটা বক্তব্যে আমার কিছু ভুলত্রুটিও থাকতে পারে; কারণ আমি তো মানুষ। আমি আরও দাবি করতে চাই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার অন্যায়ভাবে কারাগারে নিক্ষেপ করার পরে স্বৈরাচারী সরকারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে আমি আমার নেত্রীর মুক্তির জন্য সমগ্র বাংলাদেশে শত শত সভা ও জনসভায় বক্তব্য রেখেছি। এমনকি ইদানীংকালে একটি দুর্ভাগ্যজনক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে আমাদের প্রিয় নেতা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের বিরুদ্ধে জঘন্যতম কুৎসিত স্লোগান দিয়ে তাকে রাজনৈতিকভাবে অপমান করা হচ্ছিল; যার উদাহরণ ‘গাছের ডালে কাউয়া———’। তখন আমিই প্রথম ইউটিউব চ্যানেলে কঠিনভাবে এর বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলাম।
সবশেষে তিনি লিখেছেন, আমার সার্বিক বক্তব্য উপস্থাপনায়, যদি প্রমাণিত হয় আমি কোন ভুল বক্তব্য দিয়েছি, তবে আমি দুঃখ প্রকাশ করবো। আমার প্রিয় দল বিএনপির কোন ক্ষতি হয়, এমন কোন কথা ও কাজ আমি করিনি এবং করবোও না। জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বের বিচার বিবেচনার প্রতি আমার সর্বোচ্চ আস্থা আছে। আশা করি, আমি সুবিচার পাবো এবং দলের বৃহত্তর স্বার্থে যেকোন সিদ্ধান্তের প্রতি সর্বদাই অনুগত থাকব।