দখিনের সময় রিপোর্ট:
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, বিচারকদের ক্ষেত্রে ‘সৎ বিচারক’ শব্দটি ব্যবহার করা এক ধরনের অতিরঞ্জন। কারণ, একজন ব্যক্তি বিচারক হওয়ার অর্থই হলো তার কাছে সততা প্রত্যাশিত। এটি বিচারকদের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা এবং বিচার বিভাগের মৌলিক ভিত্তি। তবে বিচার বিভাগের সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে শুধু আর্থিক দুর্নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখলে হবে না। এর পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির বিষয়টিও সামনে আনতে হবে।
রোববার (৮ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে বিচারকদের নিয়ে আয়োজিত ‘জুডিসিয়াল ইন্টিগ্রিটি ওয়ার্কশপে’ বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী। এ সময় আগামী ১৯ নভেম্বর আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা-সংক্রান্ত মামলার রায়ে বাংলাদেশ ন্যায়বিচার পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগে হাতে গোনা কয়েকজন বিচারক হয়তো আর্থিক দুর্নীতিতে জড়িত হয়েছেন। তবে যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিষয়ে সরকার ও প্রধান বিচারপতি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিচার বিভাগের সংকটের বড় একটি জায়গা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি। আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি বাংলাদেশের বিচার বিভাগ ও দেশের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, বিচারকদের আর্থিক দুর্নীতির পাশাপাশি যারা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট এবং যাদের কর্মকাণ্ডে সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তাদের বিষয়েও কথা বলা উচিত। একই সঙ্গে বিচারকদের পেশাগত পরিশ্রম, সততা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে।
বিচারকদের জীবনযাত্রার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, মফস্বলের একজন বিচারক সরকারি বাসা ব্যবহার করলে বেতনের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া হিসেবে কেটে নেওয়া হয়। অথচ তিনি এর চেয়ে কম খরচে অন্য বাসা ভাড়া নিয়ে সেখান থেকে রিকশায় আদালতে যাতায়াত করেন। প্রতিদিন সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের সাজা দিয়ে আবার রিকশায় বাসায় ফেরেন। বিচারকদের এমন জীবনযাপন ও সততার দৃষ্টান্তও গণমাধ্যমে তুলে ধরা প্রয়োজন। আইনমন্ত্রী বলেন, অধস্তন আদালতের বিচারকদের একটি বড় অংশ দেশের মেধাবী তরুণদের থেকে নিয়োগ পান। তারা সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত নিরলসভাবে কাজ করেন। তাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা রাখা উচিত। বিচারকদের ইতিবাচক দিকগুলো সামনে এলে বিচার বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আসাদুজ্জামান বলেন, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনার নামে ক্ষমতার অতিরিক্ত প্রয়োগ হয়েছে, যা জনগণের স্বার্থের বিপরীতে গেছে। এ প্রসঙ্গে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়ের উদাহরণ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, ওই রায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে দেশকে ফ্যাসিবাদের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছিল। তার মতে, এটি আর্থিক দুর্নীতির ফল নয়; বরং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতির উদাহরণ। তিনি আরও বলেন, অতীতের বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগ নাগরিকের অধিকার রক্ষায় প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।
সালাউদ্দিনের গুমের ঘটনা এবং মির্জা সুলতান রাজার মামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে আবেদন করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুরক্ষা দিতে বিচার বিভাগ ব্যর্থ হয়েছিল। রক্ষীবাহিনীর হাতে গুমের শিকার ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে আইনমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে যারা বিরোধিতা করেছে এবং গণহত্যায় জড়িত ছিল, তাদের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলতে হবে, তেমনি পরবর্তী বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার থাকতে হবে।