দখিনের সময় ডেস্ক:
ভারতীয় সুন্দরীদের কথা বললেই মাথায় আসে ঐশ্বর্য রাই, সুস্মিতা সেন, প্রিয়ঙ্কা চোপড়া জোনাসদের নাম। কিন্তু পামেলা বোর্দেস বা পামেলা সিংহের নাম কত জন জানেন? অথচ ’৮০-’৯০-এর দশকে ব্রিটেনের তাবড় ব্যক্তিত্বেরা তখন মজে ছিলেন এক ভারতীয় ললনার সৌন্দর্যে। তাঁর সঙ্গ পেতে লাইন পড়ত নেতাদেরও। পামেলা সিংহ বা পামেলা বোর্দেস। তিনি আলোকচিত্রী এবং সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিজয়ী। ১৯৮২ সালে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার খেতাব অর্জন করেছিলেন তিনি।
১৯৬১ সালে হরিয়ানার রোহতক জেলায় পামেলার জন্ম। বাবা ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর মহিন্দর সিংহ কদিয়ান। পামেলার পড়াশোনা জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবী গার্লস পাবলিক স্কুলে। স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে সাহিত্যের অধ্যয়নের জন্য দিল্লির লেডি শ্রী রাম কলেজে ভর্তি হন পামেলা। ১৯৮২ সালে তিনি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার খেতাব জয় করেন এবং একই বছর আন্তর্জাতিক সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন। অসাধারণ রূপের অধিকারী পামেলা ফটোসাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ফটোসাংবাদিকতায় দক্ষতা বাড়ানোর জন্য নিউ ইয়র্কের পার্সন্স স্কুল অফ ডিজ়াইন, ফ্রান্সের দ্য আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অফ প্যারিস এবং নিউ ইয়র্কের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অফ ফটোগ্রাফিতেও পড়াশোনা করেন পামেলা।
পরে ইউরোপে চলে যান পামেলা। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় অস্ত্র ব্যবসায়ী হেনরি বোর্দেসের সঙ্গে। বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। তবে সেই বিয়ে বেশিদিন টেকেনি। অনেকে বলেন, আসলে এক পুরুষের সঙ্গে জীবন কাটিয়ে দেওয়ার মতো মহিলা ছিলেন না পামেলা। পামেলা সম্পর্কে ব্রিটিশ সাংবাদিক লিন্ডা লি-পটার বলেছিলেন, ‘‘আমি দু’সপ্তাহ পামেলার সঙ্গে কাটিয়েছি এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, তিনি অত্যন্ত আত্মকেন্দ্রিক, পুরোপুরি অনৈতিক এবং নীতিবোধহীন, যা যথেষ্ট বিরক্তিকর। তবে এই ধরনের বিশেষণের প্রেক্ষাপটেই তাঁর জীবনকাহিনী বর্তমান সময়ের জন্য বেশ প্রাসঙ্গিক।”
সৌন্দর্য, শিক্ষা এবং সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার বিজয়ী হিসেবে খ্যাতি— এই তিনই ছিল পামেলার। তবে এর বাইরেও তার অন্য একটি লক্ষ্য ছিল, আর তা হল ক্ষমতা। ক্ষমতা অর্জনের জন্য মানুষ সাধারণত দক্ষতা বা যোগ্যতাকে কাজে লাগান। কিন্তু বলা হয় পামেলা বেছে নিয়েছিলেন যৌনতাকে। ব্রিটেনের গণমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্ক এবং তা নিয়ে সৃষ্ট কেলেঙ্কারির কারণে ৯০-এর দশকে ব্রিটেনে রীতিমতো কুখ্যাত হয়ে ওঠেন পামেলা। তাঁকে নিয়ে মুচমুচে খবরও কম লেখা হত না। পামেলা সেই সময় ‘সানডে টাইমস’-এর সম্পাদক অ্যান্ড্রু নিলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। এ ছাড়া প্রভাবশালী মহলের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা যেত।
বলা হয় পামেলার জীবনে আসা উল্লেখযোগ্য পুরুষদের মধ্যে রয়েছেন, অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগি, স্পেনের জনপ্রিয় গায়ক হুলিও ইগলেসিয়াস, ব্রিটিশ অশ্বারোহী মার্ক ফিলিপস, আমেরিকার জকি স্টিভ কসেন, আমেরিকান অভিনেতা জিম ডেভিডসন, ব্রিটেনের পার্লামেন্ট সদস্য কলিন মইনিহান এবং ব্রিটিশ বেসিস্ট বিল ওয়াইম্যান। দুঃখজনক ভাবে, এর মধ্যে কোনও সম্পর্কই টেকেনি। বলা হয়, বার বার ভুল মানুষের দরজায় কড়া নেড়েছিলেন পামেলা।
শোনা যায়, ব্রিটেনের সে সময়ের রাজনীতির দুই গুরুত্বপূর্ণ নেতা ডেভিড শ এবং হেনরি বেলিংহাম, পামেলার জন্য ‘হাউস অফ কমন্স’-এর একটি নিরাপত্তা পাস জোগাড় করেছিলেন। সেই সময়ে পামেলা নিজেকে গবেষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। টোরি দলের ক্রীড়ামন্ত্রী কলিন মইনিহানের সঙ্গী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন পামেলা। ‘ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড’ পত্রিকা তাঁর নাম আহমেদ নামের লিবিয়ার এক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গেও জড়িয়েছিল। এ ছাড়া সৌদির অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির সঙ্গেও নাম জড়িয়েছিল পামেলার।
পামেলার যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু তিনি তখন বুঝতে পারেননি যে, অনেক পরে এই বিষয়টিই তাঁর জীবনের মোড় পুরোপুরি ঘুরিয়ে দেবে। তাঁর করা সব পদক্ষেপ তাঁর বিরুদ্ধেই চলে যাবে। অভিযোগ ওঠে, ব্রিটেনে দ্বৈত জীবন যাপন করতেন পামেলা। এক দিকে তিনি ছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী, অন্য দিকে বিত্তশালী এবং প্রভাবশালী মহলে অবাধে আনাগোনা করা যৌনকর্মী। অভিযোগ ওঠে, ১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে পামেলা একটি যৌনপল্লিতে কাজ করতেন। সেখান থেকে ব্রিটিশ প্রচারক (পাব্লিসিস্ট) ম্যাক্স ক্লিফোর্ডের একজন মক্কেলকে বিভিন্ন পরিষেবা দেওয়া হত। ক্লিফোর্ড সেই যৌনপল্লির পরিচালিকাকে তাঁর অধীনে কর্মরত মহিলা এবং মক্কেলদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে বলেন। ক্লিফোর্ড জানতে পারেন যে, বোর্দেস নামের এক নারী একই সময়ে ‘দ্য সানডে টাইমস’-এর সম্পাদক অ্যান্ড্রু নিল, ‘দ্য অবজ়ারভার’-এর সম্পাদক ডোনাল্ড ট্রেলফোর্ড, কনজ়ারভেটিভ দলের মন্ত্রী কলিন মইনিহান এবং অস্ত্র ব্যবসায়ী আদনান খাশোগির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িত ছিলেন।
এর পরেই ক্লিফোর্ড ‘নিউজ় অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর সম্পাদক প্যাটসি চ্যাপম্যানকে ফোন করেন এবং ওই যৌনপল্লির পরিচালিকার উপর নজর রাখা এক জন অনুসন্ধানী সাংবাদিকের মাধ্যমে তাঁকে বোর্দেস সম্পর্কিত তথ্যগুলি ধাপে ধাপে সরবরাহ করেন। ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে ‘কল গার্ল ওয়ার্কস ইন কমন্স’ (সংসদ ভবনে কাজ করেন এক যৌনকর্মী) শিরোনামে এই ঘটনাটি প্রকাশিত হয়। কারণ জানা গিয়েছিল যে, ডেভিড শ এবং হেনরি বেলিংহাম নামের দুই সংসদ সদস্যের সহায়তায় বোর্দেস ‘হাউস অফ কমন্স’-এ প্রবেশের একটি নিরাপত্তা পাস পেয়েছিলেন।
ক্লিফোর্ড দাবি করেন, বোর্দেস কখনওই তাঁর মক্কেল ছিলেন না। তিনি আরও বলেন, ঘটনাটি ‘লিখে দেওয়ার’ বিনিময়ে তিনি পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন, যা ওই যৌনপল্লির পরিচালিকাকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রচারের হাত থেকে রক্ষা করেছিল। ‘নিউজ় অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ পত্রিকা ইঙ্গিত দেয় যে, বোর্দেস এক জন যৌনকর্মী (কল গার্ল) ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে পামেলার কর্মকাণ্ড নিয়ে একের পর এক কেলেঙ্কারি ফাঁস হয়। একটি ট্যাবলয়েডে দাবি করা হয়, পামেলা এক সাংবাদিকের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হতেন। এর বিনিময়ে সপ্তাহের কর্মদিবসগুলিতে ৫০০ ইউরো এবং সপ্তাহান্তে ২০০০ ইউরো নিতেন।
‘দ্য সানডে টেলিগ্রাফ’ অ্যান্ড্রু নিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, তিনি বিষয়টি জানতেন এবং এ কারণে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের সম্পাদনার দায়িত্বে থাকার যোগ্য নন। অন্য দিকে বিষয়টি নিয়ে মানহানির অভিযোগে মামলা করেন অ্যান্ড্রু। ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে তিনি মামলায় জয়ী হন। আদালত তাঁকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ, ধীরে ধীরে তিনি ক্ষমতা ও অর্থের লোভে উচ্চবিত্ত সমাজের ‘কল গার্ল’-এ পরিণত হন পামেলা। পামেলাকে লন্ডনের ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলি পর্নোগ্রাফিক আলোচনার বিষয়বস্তুতেও পরিণত করে। পামেলার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে তাঁর পরিবার। কোনও উপায় না দেখে পামেলাকে লন্ডনের সাড়ে সাত লাখ ইউরো মূল্যের বিলাসবহুল পেন্টহাউসের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে আত্মগোপনে যেতে হয়। এর পর শুরু হয় পামেলার তারকাখ্যাতির পতন। এক সময়ের অত্যন্ত পরিচিত, জমকালো ও আকর্ষণীয় পামেলা সব কিছু পিছনে ফেলে এখন গোয়ায় বসবাস করেন। তিনি এখন লোকচক্ষুর আড়ালে এক নিভৃত জীবন কাটাচ্ছেন। ফটোগ্রাফি থেকে পাওয়া সামান্য আয়েই তাঁর দিন চলে।
এখন ভবঘুরে জীবনযাপন করছেন পামেলা। তাঁর নতুন বন্ধু মহলে রয়েছেন তাঁর চেয়ে অনেক কমবয়সি মানুষ। ষাটের কোঠায় থাকা পামেলাকে এখনকার নতুন চেহারায় চেনা দায়। তিনি নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন এবং ‘হিমালয়ান ক্লাইম্বিং ক্লাব’-এর এক জন সদস্য। সংবাদমাধ্যম ও গণমাধ্যমকে এড়িয়ে চলেন। যদিও অনেকে এখনও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। বলতে গেলে বাইরের জগত থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন পামেলা। জনসমক্ষে কথা বলতেও রাজি নন তিনি। বেছে নিয়েছেন একাকী জীবন। বর্তমানে গোয়ার একটি ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন। যোগব্যায়াম, বই পড়া আর পর্বতারোহণের শখ নিয়ে তিনি এক অতি সাধারণ জীবন অতিবাহিত করছেন।