• ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুলিশকে বেবি ফিডার ধরিয়ে দিলে কেমন হয়?

দখিনের সময়
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৫, ০৮:৩২ পূর্বাহ্ণ
পুলিশকে বেবি ফিডার ধরিয়ে দিলে কেমন হয়?
পুলিশকে নিয়ে  নানান আলোচনা-সালোচনা আছে। এবং চলমান নিরন্তর। এই সব আলোচনায় জ্ঞাণ দানের কোন সীমা-পরিসীমা নেই। হাতি খাদায় পড়ার মতো অবস্থায় আছে পুলিশ। এমনকি পুলিশের অস্ত্র নিয়েও প্রশাসন ক্যাডারের কোতয়ালদের অনেকেই নানান বয়ান উদগিরণ করা বরছেন। প্রতিক্রিয়ায়, কেউ কেউ বিরক্ত হয়ে বলছেন, ‘পুলিশকে হাফপ্যান্ট পরিয়ে মুখে বেবি ফিডার এবং হাতে পাঠখড়ি ধরিয়ে দিলে কেমন হয়? বিপদে পড়লে পাটখড়িকে সাদাছড়ি হিসেবে ব্যবহার করে অন্ধ সাজার কৌশলে জীবন রক্ষার চেষ্টা করতে পারবে।’ বলা হয় পুলিশকে এই দশার মুখো মুখোমুখি দাড়করিয়ে দিয়েছে পতিত হাসিনা সরকার। অবশ্য এর পিছনে অন্যরকম খেলার কথাও বলা হচ্ছে কোনকোন মহল থেকে।
বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ
হয়েছেন শেখ হাসিনা
পলাতক ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ছয় মাসেও নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। কারও কারও মতে, অহমের আধিক্যে আক্রান্ত হয়ে ভুলের চক্করে হাসিনা সরকার ভুলের অলঙ্ঘনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তিনি বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছিলেন। আবার কারও মতে, বর্তমান সরকারের কোনো কোনো উপদেষ্টা কবিগুরুর গানের আবেশে আছেন, ‘আয় তবে সহচরী, হাতে হাতে ধরি ধরি নাচিবি ঘিরি ঘিরি, গাহিবি গান। আন্ তবে বীণা…।’ কিন্তু মাঠের বাস্তবতা মোটেই এরকম নয়। বরং বেশ জটিল।
এরপরও উপদেষ্টাদের কেউ ক্ষমতার মমতায় মোহাবিষ্ট হয়ে থাকতে পারেন। যে কারণে হয়তো তাদের মননে সামগ্রিক কঠিন বাস্তবতা সেভাবে ধরা দিচ্ছে না। তা না হয়ে তারা সেই কথা বিবেচনায় রাখতেন, ক্ষমতায় আহরণ মানে বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া। কখনো আবার এই বাঘ আগুনেরও হতে পারে। ক্ষমতাসীনদের পছন্দ না হলেও এটিই কিন্তু বাস্তবতা। শুধু তাই নয়, লিউ টলস্টয়ের উপন্যাসে প্রধান করণীয় প্রসঙ্গ যে বাণী দেওয়া আছে তাও সম্ভবত উপেক্ষিত হচ্ছে। অথবা কিশোরকালে পড়েছেন বলে বার্ধক্যে ভুলে গেছেন। যে কারণে প্রধান করণীয় পাশ কাটিয়ে সংস্কারের যেন চেইন শপ খোলা হয়েছে।
এদিকে যেগুলো সরকারের জরুরি করণীয় তার সবই যে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তা অনেকেই ক্রমাগত বলে আসছেন। একাধিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে, হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলায় ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম হচ্ছে—‘সমালোচনা আর চাপের মুখে সরকারের সামনে যে ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ’। আন্তর্জাতিক এ গণমাধ্যমের উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুসারে ছয়টি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—নির্বাচন, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, সংস্কার, বিচার, দ্রব্যমূল্য, বিনিয়োগ ও আইনশৃঙ্খলা।
পরিস্থিতির উন্নতি না করে
নির্বাচন  এক সাজানো ফাঁদ
বিবিসি বাংলায় ৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত‘সমালোচনা আর চাপের মুখে সরকারের সামনে যে ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ’ শিরোনামের প্রতিবেদনে সরকারের সামনে যে ছয়টি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে তার মধ্যে এক নম্বর নির্বাচনের সঙ্গে ছয় নম্বর, মানে আইনশৃঙ্খলা ইউর সঙ্গে কিউর মতো সম্পৃক্ত। কিন্তু এই আইনশৃঙ্খলা কোন দশায় আছে? একবাক্যে বলা চলে, অনেকটাই তলানিতে!
এ ধারা চলমান রেখে আর যাই হোক, নির্বাচন অনুষ্ঠান অকল্পনীয় বিষয়। যে পরিস্থিতি বিরাজমান তাতে সুন্নতে খাতনা অনুষ্ঠান আয়োজন করতেও সাধারণ মানুষ দশবার ভাবে। ফলে সরলভাবে বলা চলে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এ চেষ্টা করলে তা হতে পারে সাজানো বিপদের ফাঁদে পা দেয়া। পরিস্থিতির উন্নতি না করে নির্বাচনের নামে সাজানো ফাঁদে সরকার পা দেবে?
আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো আলামত দৃশ্যমান নয়। এমনকি বিশাল আওয়াজ দিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি শুরু করা ডেভিল হান্ট থেকেও খুব একটা ফজিলত পাওয়ার লক্ষণ জাহেরে স্পষ্ট নয়। বাতেনে কী আছে তা বোঝাযাচ্ছে না। তবে এটা বোধাযাচ্ছে, এতে জনপ্রত্যাশা পুরণ করা যাবে না। এদিকে নানান ধরনের কথা এরই মধ্যে চাউর হয়ে গেছে। আর এ অভিযানে অস্ত্র উদ্ধার প্রসঙ্গ নিয়ে তো খোদ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই প্রকারান্তরে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি আমলে ২০০২ সালে ১৬ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পরিচালিত ক্লিন হার্ট অপারেশনের নানান সমালোচনা সত্ত্বেও বেশ সাফল্য এসেছিল। কিন্তু এবার ডেভিল হান্টে সাফল্যের আশা ক্ষীণ। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিষয়ে পর্যবেক্ষকরা খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না। আর বাস্তবতাও তাই। এ ছাড়া ইতিহাস বলে, এ ধরনের অপারেশনে সাবোসিটারের মতো সাময়িক প্রশমন দিলেও তা স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়।
স্মরণ করা যেতে পারে, বিএনপির শাসনামলে ক্লিন হার্ট অপারেশন চলেছিল প্রায় তিন মাস। এরপর পরিস্থিতি সামলানোর জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুসারে র‌্যাবের কার্যক্রম শুরু হয়। সেই র‌্যাবও যে আইনশৃঙ্খলা খুব একটা কাজে এসেছে, তা কিন্তু নয়। আর এ বাহিনী গঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে এ কথা বলাও ছিলো। এরপরও এই এলিট বাহিনীর বেশ অবদান আছে। কিন্তু হাসিনা সরকারের অনৈতিক অতি অপব্যবহার এবং নানান অপকর্মের গ্লানিতে নিমজ্জিত র‌্যাব যে কোনো সময় প্রাণহীন হওয়ার আশঙ্কায় ছিলো বেশ কয়েক বছর ধরে। আর বিগত ছয় মাস ঝিম মেরে ছিলো অনেকটা কার্তিক মাসের ডাহুকের মতো । কিন্তু অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, র‌্যাব কোন গ্রীণ সিগনাল পেয়েছে। হয়তো এ কারণেই এলিট এই বাহিনী দৃশ্যত মাঠে মহরা দেয়েছে শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে।  অইরাতে রাজধানীতে অভিযানে জোরালোভাবে উপস্থিত ছিলেন র‌্যাবের খোদ ডিজি এ কে এম শহীদুর রহমান। তিনি তাঁর বাহিনীর লক্ষ্য নিয়ে প্রত্যয়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। যা অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে। এদিকে রোববার বিদবাগত রাত তিনটার মানে ২৩ ফেব্রুয়ারি  সংসবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। মনে করা হচ্ছে, উপদেষ্টা আসলে সরকারের হার্ড লাইনের জানান দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির অভিযোগ এনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবী করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী দেয়া আল্টিমেটাম দিয়েছে। যার মেয়াদ শেষ সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে।  পদত্যাগ প্রসঙ্গে সহনশীল ব্যক্তিত্ব জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, পদত্যাগ তো পদত্যাগ, অনেকে আমার জানাজাও পড়ে ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো, ৫৩ বছরে কোনো মিডিয়া কখনো তা বলেনি। পরিস্থিতি আগের মতোই রয়েছে, তবে সন্তোষজনক। ছোটখাটো ঘটনা ঘটছে। মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার, আসলেই কী পরিস্থিতি সন্তোষজনক? এ প্রশ্ন জনতার!
গরিবের স্ত্রী হগলের
ভাবিসাব
আইনশৃঙ্খলার ভবিষ্যত কী? শতবছর ধরে প্রমাণিত সত্য, পুলিশের সাধ্যের বাইরের কাজের জন্য বিএনপি সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে র‌্যাব। যেমন— মুজিব সরকারের সময় প্রতিষ্ঠা করা হয় রক্ষীবাহিনী। এরপরও বিভিন্ন সময় বিজিবি নামাতে হয়, লাগে সেনাবাহিনীও। আর নির্বাচনের সময় তো সেনাবাহিনী নামানোর জিকিরে মুখে ফেনা ওঠে।
বলাবাহুল্য, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে পথে যাচ্ছে, তাতে অদূরে অথবা সুদূর নির্বাচন করতে চাইলে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী নিয়োগ ছাড়া আর কোনো বিকল্প আছে বলে মনে হয় না। কারও কারও পছন্দ না হলেও এটিই বাস্তবতা। তবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাঠের পরিস্থিতি সামলাতে ভিত্তি হতে হবে পুলিশ। এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সেই পুলিশের দশা কী? এক কথায় মাজুল! এদিকে বিলুপ্তির আওয়াজের র‌্যাব নিউট্রাল গিয়ারে আছে বলে মনে করা হয়। আর দেশ রক্ষায় সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে মাঠে আছে। এ ধারা কতদিন অব্যাহত রাখা সম্ভব? এ এক মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন।
সামগ্রিক বাস্তবতায় আইনশৃঙ্খলা এবং নিকটে অথবা দূরবর্তী কালে নির্বাচনের সময় পুলিশকে বিবেচনার বাইরে রাখার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যে সর্বনাশ করেছে, সেই তালিকার শীর্ষে আছে পুলিশ। বিশেষ করে জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ যেভাবে ফোকাসে এসেছে তাতে মনে হতে পারে, যত দোষ পুলিশের। এ অবস্থায় নতুন প্রবচন হতে পারে, ‘পুলিশ নন্দঘোষ!’ কারও কারও বিবেচনায়, পুলিশ অনেকটা ভূতের ছায়া! এরপরও পুলিশ নিয়ে সামনে নেতিবাচক কথাবার্তা চলমান। নিন্দা ছাড়া সাধারণত কেউ এখন আর পুলিশের নাম মুখে আনে না। আবার সেই প্রবচন, ‘গরিবের স্ত্রী হগলের ভাবিসাব!’
প্রশাসন ক্যাডারের
কোতোয়ালরা মাশাআল্লাহ!
বরাবরের মতোই এখনো মাশাআল্লাহ তুঙ্গে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের কোতোয়ালরা। ১৫ বছরে এদের অনেক কেচ্ছাকাহিনি আছে। আগেও ছিল। বর্তমান সরকার আমলে এর অবসান হয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। বরং ডিসি হওয়ার বাসনায় অনেকের বিরুদ্ধেই টাকার বস্তা নিয়ে ছোটাছুটি খবর প্রথমসারির জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে। অনেকে আবার সচিবালয়ে মারামারি-হাতাহাতি করার জন্য বেশ খ্যাত। তবুও এরা হাসিনা আমলের চেয়েও অধিক হারে সর্বত্র দাপটে বিরাজমান।  আমলাদের মাথায় তোলার যে কম্ম শেখ হাসিনা করে গেছেন, তা থেকে বর্তমান সরকার বের হতে পারেনি।
প্রতি বছর ডিসি সম্মেলনের আগে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের কাছ থেকে নানা বিষয়ে প্রস্তাব চায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। এ সুযোগে প্রশাসন ক্যাডারের রত্নরা পুলিশ নিয়ে এন্তার জ্ঞান দিয়েছেন। তাদের কাছ থেকে তিন শতাধিক প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব পুলিশসংশ্লিষ্ট। এসব প্রস্তাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ ছাড়াও জেলা পুলিশের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারির ক্ষমতা চাওয়া হয়েছে ডিসিদের পক্ষ থেকে। সবচেয়ে মজার প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেটের ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। তার প্রস্তাব, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও ছররা গুলি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।’তার মতে, ‘জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, ছররা গুলিও মানবদেহে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের হাসপাতালে দেখতে গিয়ে উপলব্ধি হয়েছে, পুলিশের হাতে শটগানও থাকা উচিত নয়।’ ধন্য, ধন্য! উর্বর মগজ আর কাহাকে বলে!
পুলিশকে বেবি ফিডার
ধরিয়ে দিলে কেমন হয়?
ডিসিবৃন্দ এবং অন্যান্য মহল থেকে যেসব প্রস্তাব এসেছে তাতে যে কারও মনে হতে পারে, সব সরকারের আমলেই পুলিশ ছাড়া সরকাররের উজির-নাজির-পাইক-পেয়াদা-কোতোয়ালরা কীর্তন গেয়ে সময় পার করেছেন এবং তারা একেকজন দেবপুত্র, পূতপবিত্র। আর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সময় তারা তো সবাই তাবলিগে গিয়েছিলেন! শুধু ঘরে-বাইরে-মাঠে-আগানে-বাগানে সর্বত্র বিরাজমান ছিল পুলিশ! যে কারণে পান থেকে চুন খসলেই পুলিশ কট!
এমনকি গাজীপুরের ৮ ফেব্রুয়ারি ঘটনার জেরে ওসিকে চাকরি হারাতে হয়েছে। ক্ষমা চাইতে হয়েছে খোদ পুলিশ কমিশনারকে। সামগ্রিক অবস্থায় মনে হয়, পুলিশকে হাফপ্যান্ট পরিয়ে মুখে বেবি ফিডার এবং হাতে পাঠখড়ি ধরিয়ে দিলে কেমন হয়? বিপদে পড়লে এ পাটখড়িকে সাদাছড়ি হিসেবে ব্যবহার করে অন্ধ সাজার কৌশলে জীবন রক্ষার চেষ্টা করতে পারবে।
পুলিশকে সেতার ধরিয়ে  রাষ্ট্র
 চালানোর যুগ কখনো ছিল না
বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, পুলিশ বাহিনীর হাতে পাটখড়ি, সাদাছড়ি অথবা সেতার ধরিয়ে দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর যুগ কখনো ছিল না। এখনো নেই। আসলে চলমান বাস্তবতায় পুলিশের হাতে আধুনিক অস্ত্র থাকা অনিবার্য। অবশ্য এজন্য পুলিশকে যোগ্য করে তুলতে হবে এবং নিয়ন্ত্রণ করতে হবে আইন দিয়ে, ব্যবস্থাপনা দিয়ে। যে ব্যবস্থাপনা পাকিস্তান আমলেও বেশ খানিকটা ছিল। সেই ধারা রহিত হলো কীভাবে?
পুলিশ বাহিনীকে মাস্তান হিসেবে ব্যবহার করার ধান্দা করলে তাই হবে, যা হাসিনা সরকারের আমলে হয়েছে। আর এ দোষে সব সরকারই কমবেশি দুষ্ট। সাবেক আইজিপি মোহাম্মদ নুরুল হুদার মতে, ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র একেবারেই না রাখার প্রস্তাব অবিবেচনাপ্রসূত। অপরাধীরা যদি প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে পুলিশকে আক্রমণ করে, তখন পুলিশ কী দিয়ে নিজেকে রক্ষা করবে?’ এ নিয়েও তো ভাবতে হবে। এটা না করে মানুষ আর পুলিশের মধ্যে বিভাজন টানা হলে তা হবে চরম অমানবিকতা। পুলিশ নাকি মানুষ—কোনো কোনো বোদ্ধাও এরকম একটি নিষ্ঠুর বিভাজনের বিলাসিতার দোলনায় দোলেন! যে কারণে বলা হয়, ‘মাছের রাজা ইলিশ আর চাকরির রাজা পুলিশ।’ প্রায় একই ভেলায় ভাসেন সাধারণ মানুষও। এমনকি সাধারণ বাস কন্ডাক্টরকে বলতে শোনা যায়, ‘ছাদে সাতজন মানুষ আর দুজন পুলিশ।
পুলিশেকে নির্বীর্যকরণেও
লাভ হবে না
দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হয়েছে এবং আইন-শৃংখলা যেখানে গিয়ে ঠেকেছে তাতে জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য নিয়োজিত পুলিশেরই জানমাল রক্ষার বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবা জরুরি। আর আইনকানুন মেরামত ও যথাযথভাবে প্রয়োগ করতে হবে। নেতৃত্বে যোগ্য এবং দক্ষদের পদায়ন করতে হবে।
 ‘আমার লোক-তাহার লোক’ খোঁজার তালে থাকলে সুফল পাওয়ার আশা করা একধরনের ধোঁকাবাজি ভিন্ন কিছু নয়। সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় না নিয়ে, পুলিশের বস্ত্র হরণ অথবা নিরস্ত্রীকরণ, এমনকি নির্বীর্যকরণেও কোনো লাভ হবে না। মূল করণীয় হচ্ছে, ক্রমাগত রাজনৈতিক ব্যবহারে বিধ্বস্ত পুলিশকে প্রকৃত অর্থেই একটি বাহিনী হিসেবে দাঁড় করানো। আর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে আইনের, ব্যক্তি বা সরকারের নয়। এর অর্থ এই নয় যে, ১৯৭৭ সালে রহিত বিধান ফিরিয়ে এনে পুলিশের ওপর ডিসি-ইউএনওদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। জরুরি হচ্ছে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ধারায় স্পষ্ট ইতি টেনে পুলিশকে একটি কার্যকর বাহিনীর অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করা।
পুলিশের আইজি বাহারুল আলম ২২ ডিসেম্বর যথার্থই বলেছেন, ‘গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক কুপ্রভাবে পুলিশ যেসব ঘটনা ঘটিয়েছে, তা পৃথিবীর কোনো পুলিশ করেনি। এমন কোনো অন্যায় নেই, যা আমরা করিনি। এসব কর্মকাণ্ড পুলিশকে মারাত্মকভাবে হেয় করেছে। পুলিশ এতটা নির্মম হতে পারে, তা চিন্তা করতেই লজ্জা হয়!’
এ লজ্জার ধারা থেকে পুলিশকে মুক্ত করতে হবে। এটা না করে বাংলা সিনেমার স্টাইলে পুলিশকে অবলা নারীজ্ঞান করে ‘লজ্জা হরণের’ কাণ্ড করতে চাইলে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। যেমন ঘোরতর বিপর্যয় অনিবার্য যদি কোনো কারণে ড. ইউনূসের নেতৃত্ব থেকে জাতি বঞ্চিত হয়!
লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক
# দৈনিক কালবেলায় প্রকাশিত,  শিরেনানাম, ‘পুলিশকে আইনের নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে’