শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়া অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় আঠারো মাস ক্ষমতায় ছিল। চুন খেয়ে মুখ পোড়ার কারণে দধি দেখে ভয় পাওয়ার নানান ধারা কাটিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েছে নতুন সরকার। একই সঙ্গে সদ্য সাবেক ড. ইউনূস সরকারের সাফল্য-ব্যর্থতা প্রসঙ্গ সরগরম আলোচনায় চলে এসেছে। কেমন ছিল ইউনূস সরকার? এ প্রশ্ন নানান জনের। কেউ কেউ আবার বিগত সরকারের পিণ্ডি চটকাচ্ছেন! আগে যে সাহস দুয়েকজন ছাড়া কেউই করেননি। এদিকে সাধারণভাবে প্রত্যাশিত ছিল, নির্বাচনকে মূল বিষয় হিসেবে গ্রহণ করবে ইউনূস সরকার। কিন্তু ক্ষমতায় অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই নানান গীত শুরু করল। বলা হলো, তাদের মূল লক্ষ্য তিনটি—সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং সরকার ঘোষিত রূপরেখার মধ্যেই সংসদ নির্বাচন আয়োজন। এসব ক্ষেত্রে ‘সফল’ কিংবা যথেষ্ট অগ্রগতির ঢোল বাজানো হয়েছে সরকারের দিক থেকে। যদিও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার ক্ষেত্রে ‘রংধনু সাফল্য’ দেখালেও অন্য কোনো সংস্কারই আসলে হয়নি। এজন্য ড. ইউনূসকে একপ্রকার দায়মুক্তি দিয়ে সরকারের ভেতরের একটি অংশকে দায়ী করা হয়। যেন হুজুরের নয়, তালবে আলেমদেরই যত দোষ! আর স্পষ্টতভাবে ফুটে উঠেছে, সরকারের মেয়াদ প্রলম্বিত করার নানান বাহানা। এ ক্ষেত্রে সরকার পথভ্রষ্ট হয়েছে বলে মনে করা হয়। আর বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি কাট টু সাইজ’—এ প্রশ্ন রয়েই গেছে। আর যা বিচারের আওতায় আনা সম্ভব ছিল না, তাতে ফেলা হয়েছে মবের ঘরে। আদিম যুগে রাজা-বাদশারা প্রতিপক্ষকে যেমন বাঘের খাঁচায় ফেলতেন। পুরোনো সেই চেতনায় শুরু থেকেই নগ্নভাবে মব ভায়োলেন্স চলতে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে বলে বলা হয়। অথবা এরা ছিল সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এ অভিযোগ উঠেছে শুরু থেকেই। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় ব্যর্থতার পাশাপাশি নারী ইস্যুতেও বিগত সরকার প্রশ্নবিদ্ধ। পর্যবেক্ষকদের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার তুলনামূলক বিচারে সফল হলেও সামাজিক বলয়ে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দেশকে নির্বাচন পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াকে কঠিন সাফল্য হিসেবে দাবি করা হলেও একে ‘অনিচ্ছাকৃত ঢেঁকি গেলা’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন কেউ কেউ। বিষয়টিকে কেউ আবার চলন্ত জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া শিশু উদ্ধারে গল্পের সঙ্গে মেলাতে চাচ্ছেন। প্রসঙ্গত, সংবর্ধনা সভায় উদ্ধারকারী প্রশ্ন করেছিলেন, ‘পেছন দিয়া আমারে ধাক্কা দিল কেঠা!’
নিশ্চয়ই অনেকেরই স্মরণ আছে, দেশবাসীর নির্বাচন আকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ড. ইউনূস নানান বয়ান উদগিরণ করেছেন। আর তার পারিষদ তো ছিলেন কয়েক ডিগ্রি সরেস। তাদের মধ্যে পরিবেশ ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান তো মাশাআল্লাহ নাম্বার ওয়ান! এরপরও নানান চাপের মুখে প্রধান উপদেষ্টা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলেন। পরে কীসের মধ্যে কী হলো আল্লাহ মালুম—লন্ডনে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর সরকার ও বিএনপি যৌথভাবে ফেব্রুয়ারিতে, রোজার আগেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয় এবং শেষতক এ প্রতিশ্রুতি রক্ষিত হয়। একই সঙ্গে সংস্কার প্রশ্নে ঘোরপ্যাঁচের গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউনূস সরকার রাষ্ট্রসংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক ১১টি কমিশন গঠন করে এবং সেসব কমিশনের সুপারিশসহ রাষ্ট্রসংস্কারের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাব চূড়ান্ত করতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। শেষ পর্যন্ত অন্তত ৩০টি বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রচার করা হয় এবং এর মধ্যে চারটি প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনেই। সরকার নিজেও সেই গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার জন্য ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করেছে। সঙ্গে পোঁ ধরেছে জামায়াত ও এনসিপি। আর অনেকটা মিউমিউ করে পক্ষে বলেছে বিএনপিও। যদিও বিষয়টি জনমনে পানিতে দাগ কাটার চেষ্টা করার চেয়ে বেশি কিছু ছিল না বলে মনে করা হয়।
এদিকে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া। জেল ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু আর মব সন্ত্রাস, সংখ্যালঘুদের ওপর বারবার হামলার ঘটনা আলোচনায় এসেছে। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর বসতবাড়িতে আগুন, ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ভালুকায় পিটিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে দিপু চন্দ্র হত্যা এবং পরপর কয়েকজন হিন্দু ব্যবসায়ী খুন হওয়ার ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। যদিও সরকারের তরফ থেকে তোতা পাখির মতো একই বয়ান দেওয়া হয়েছে, ‘সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার বেশিরভাগ ঘটনা রাজনৈতিক কারণেই ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়।’ ভাবখানা এই, রাজনীতির সিল দিতে পারলেই সাত খুন মাফ। প্রসঙ্গত, মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় আসা ড. ইউনূস সরকার এসেছিল এবং সে কারণে সরকারের সামনে তখন বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র। গভীরভাবে বিবেচনা করলে এ তিনটির মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সরকার কিঞ্চিৎ ভালো করেছে বলে অনেকই মনে করেন। আর রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সফলতা হলো দেশকে নির্বাচন পর্যন্ত নিয়ে আসা। এটি কিন্তু অনেক বড় সাফল্য। কিন্তু চরম ব্যর্থতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে সামাজিক ক্ষেত্রে। একটি গোষ্ঠী যেভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেটাই ছিল বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। সামাজিক ক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ প্রকট হয়ে ধরা পড়ে ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনায়। রাতে কয়েক ঘণ্টার এ তাণ্ডব চললেও সরকারের দিক থেকে কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। বরং এ আগুনের উত্তাপে সরকারের কেউ কেউ তীব্র শীতে উষ্ণতা উপভোগ করেছেন। বলা হয়, মব কালচারের নেপথ্যে থাকা শক্তিকে দমন অথবা ম্যানেজে ব্যর্থতা সরকারের দীনতাকেই মানুষের দৃষ্টিতে প্রকট করে তুলেছে। এদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সফল হতে পারেনি। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির যে চিত্র প্রকাশ করেছে, সে অনুযায়ী ডিসেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এর আগে নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ। যদিও বিগত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারাটা তাদের জন্য একটি সাফল্য। বিশেষ করে গত বছর রোজায় দ্রব্যমূল্য খুব একটা বাড়েনি বলেই মনে করছেন তারা। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলছেন ভিন্ন কথা। অনেকের মতে, সংস্কার কমিশন গঠন ও জুলাই চার্টারের কৃতিত্ব সরকার দাবি করতে পারে। কিন্তু শিক্ষাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংস্কার কমিশনই হয়নি, আবার যেসব বিষয়ে কমিশন হয়েছে সেগুলোর মূল বিষয় অধরাই থেকে গেছে। এ প্রসঙ্গে অনেকেই মনে করেন, সংস্কারের যে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, সেটি সরকারের বিবেচনাতেই ছিল না। এ হচ্ছে পাটগাছ কাটার অভিজ্ঞতা নিয়ে বটগাছ কাটার উদ্যোগের ফল। যদিও একপ্রকার বাচিক শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এক আলোচনায় বলেছেন, ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যতটা সংস্কার হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে তেমনটি আর হয়নি।’
এদিকে সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, সংস্কারের পরেই গুরুত্ব পেয়েছে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার’। এরই মধ্যে একটি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছেন আদালত। গত অক্টোবরে আইন মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, জুলাই অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্দেশে হত্যার অভিযোগে রেকর্ড করা হয়েছে ৮৩৭টি মামলা। এর মধ্যে ৪৫টি মামলার বিচারকাজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন ফৌজদারি আদালতে পুলিশ ১৯টি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। তবে সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করায় তীব্র সমালোচনা আছে। সাংবাদিকসহ অনেকের বিরুদ্ধে অনেক হত্যা মামলা হয়েছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এরপরও অনেককে আটক রাখা হয়েছে, যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা ইউনূস সরকার কখনো দেয়নি। অনেকেই মনে করেন, হত্যাসহ নানান অভিযোগে সাংবাদিক হয়রানির ধারার অবসান এখন সময়ের ব্যাপার। প্রসঙ্গত, বেশ কিছুদিন সরাসরি দৈনিক দিনকাল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংবাদপত্রের অনেক কিছেই খুব ভেতর থেকেই জানেন।
শেষ কথা হচ্ছে, ‘ভিক্ষা চাই না কুত্তা ঠেকাও’ প্রবচন ধারণ করে কোনোরকম সম্মান নিয়ে সদ্য বিদায়ী ইউনূস সরকার আমলে শুরু থেকেই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সুফি-দরবেশ-বাউলদের মাজার আক্রান্ত হতে শুরু করে। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও গত ১৮ মাসে বারবার আলোচনায় এসেছে। এমনকি ২০২৫ সালের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসেই সারা দেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিল পুলিশ। এরপরও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। উল্টো নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় জুড়েই বিভিন্ন সময়ে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। একই সঙ্গে নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট ঘিরে নারীদের আক্রমণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের হেনস্তার ঘটনা ঘটেছে। শুধু তাই নয়, গত বছর মার্চে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস নিজেই বলেছিলেন, “সম্প্রতি নারীদের ওপর যে জঘন্য হামলার খবর আসছে, তা গভীরভাবে উদ্বেগজনক। এটি ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তার সম্পূর্ণ বিপরীত।” কিন্তু যাত্রাগানের বিবেক চরিত্রের মতো এ বয়ানে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়েছে—এমনটা বলার উপায় নেই। বরং দেশের ইতিহাসের নারীর সমতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ধাক্কাই এসেছে ইউনূস সরকারের আমলে। নারীবিদ্বেষ প্রতিহত করার ক্ষেত্রে সরকার সৎ-সাহস দেখাতে পারেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধ, বাক স্বাধীনতা, নারীর সমতাসহ ৭১ ও ২৪-এর মৌলিক চেতনার বিষয়গুলোর জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি হয়। সামগ্রিক বিবেচনায় বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে মব সন্ত্রাস, যাদের হামলায় গত দেড় বছরে আক্রান্ত হয়েছে সর্বোচ্চ বিচারালয়, উচ্চধাপ থেকে ছোটখাটো সংবাদপত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মারক থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যন্ত। মব সন্ত্রাসে মানুষ পুড়িয়ে মারা হয়। এমন কোনো ক্ষেত্র ছিল না, যা মব সন্ত্রাসের আওতার বাইরে ছিল। ইউনূস সরকারের আমলে অনেকেই ‘মবের রাজত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকেন। এরপরও মানতেই হবে, ‘শেষ ভালো যার সব ভালো তার’। এ আপ্তবাক্য অনুসারে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং অতি সুবোধ বালকের মতো ক্ষমতা হস্তান্তরের কারণে ড. ইউনূস সরকার শুধু মন্দের ভালো নয়, ভালোর ওপর ভালো হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। অতএব বখেদমতে হুজুরে আলা ড. ইউনূসকে অন্তরের অভিবাদন। এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নতুন সরকারের, নতুন রাজনৈতিক ধারার। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত এ কাজ কতটা সম্ভব হবে সেটিই এখন দেখার বিষয়। এ ব্যাপারে মনের গহিনে যতই শঙ্কা থাকুক না কেন, এখনই তা ব্যক্ত করা শোভন নয় বলে বিবেচিত হতেই পারে। বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্যই তোলা থাক।