দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই তা এক বাস্তবতা। তবে যে গণতন্ত্রের জন্য তিনি লড়েছেন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে তা জাতির কাছে ফিরে আসবে এমনটিই আশা করছে দেশবাসী। এই নির্বাচনে দেশনেত্রীর জনপ্রিয়তা একাত্তর ও চব্বিশের পরাজিত শক্তির গোপন জোটের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী শক্তির জয়ে অবদান রাখবে বলেও আশা করা হচ্ছে। বিদায়ি বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার শেষবিদায়পর্বে জানাজায় কোটি মানুষের সশরীরে অংশগ্রহণ ও সারা দেশে অসংখ্য গায়েবানা জানাজা এবং দেশবাসীর শ্রদ্ধার উচ্চতা দেখেছে বিশ্ববাসী। বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জনসমুদ্র শব্দটিও যেন বিশালত্ব ধারণ করার মতো মোক্ষম নয়। বরং দলমতনির্বিশেষে শোকার্ত মানুষের এই ঢল প্রমাণ করেছে বেগম খালেদা জিয়া মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ, সবাই একবাক্যে স্বীকার করেছেন, ‘এমন জানাজা এর আগে আর দেখেননি কেউ।’ আর এই জানাজা কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্যতম মাইলফলক। ইতিহাসের একটা বিরল সম্মান নিয়ে খালেদা জিয়া অন্তিমপথের যাত্রী হলেন। কিন্তু রেখে গেছেন অমোছনীয় ছায়া।
জানাজার বিশালত্বে যে কেউ বুঝবেন, ’২৫-এর ৩০ ডিসেম্বর অনন্তযাত্রার পথিক বেগম খালেদা জিয়া এখন আর বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন অথবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ে ব্র্যাকেটে নেই। এখন তিনি একেবারেই সমগ্র বাংলাদেশের। আবার তাঁর এই অধিষ্ঠান হাওয়া থেকে আসেনি। এটি সম্ভব হয়েছে সিরিজ বিজয়ের মাধ্যমে। আর এ বিজয়ের ভিত্তি হচ্ছে একাগ্রতা ও বিচক্ষণ আপসহীনতা। যে কারণে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে স্বর্গ থেকে পতনের মতো স্বামীহারা হয়ে ৪১ বছরের রাজনীতির কঠিন ও পঙ্কিল পথ চলতে পেরেছেন। আর প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ’৮১ সালের ৩০ মে শহীদ হওয়ার পর এলোমেলো বিএনপিকে শুধু ধরে রাখা নয়, বিকশিত করেছেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপিকে তিনবার ক্ষমতাসীন করেছেন। একই সঙ্গে শিশুকালে এতিম হওয়া তারেক রহমানকে বড় করে তুলেছেন, যোগ্য করেছেন রাজনীতির প্রধান নেতা হওয়ার জন্য। মায়ের মৃত্যুর পর এখন তারেক রহমান কেবল বিএনপিপ্রধান হিসেবে বিবেচিত নন, আগামী সরকারপ্রধান হিসেবেও দেশবাসীর মানসপটে আসন করে নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহলও এই বাস্তবতা ধারণ করেছে। নিঃসন্দেহে এটি বেগম খালেদা জিয়ার একটি হিমালয়সম অর্জন। এর চেয়েও বিশাল অর্জন আছে এবং এখানেই খালেদা জিয়া অতুলনীয়। এখানে তিনি কারও সঙ্গে তুল্য নন, তিনি অনন্য।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, বেগম জিয়া কেন অতুলনীয়? এর কারণ অনেক। আর প্রধান কারণ দুটি। এক. খালেদা জিয়ার নিখাদ দেশপ্রেম। দুই. তাঁর ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা। যা তাঁকে আপসহীন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রধানত এই দুটি ইনবিল্ড বৈশিষ্ট্যের কারণেই তিনি দেশের দুই স্বৈরাচার জেনারেল এরশাদ ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছেন। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, স্বৈরাচারের পতন কেবল ব্যক্তি অথবা কোনো সরকারের অবসান নয়, এ হচ্ছে দেশ রাহুমুক্ত হওয়া। এই অসাধ্য সাধন বেগম খালেদা জিয়া দুবার করেছেন। আর দুবারই তাঁর দেশপ্রেম ও আপসহীন অবস্থানই ছিল সাফল্যের চাবিকাঠি। কেবল মৌলিক নয়, স্বৈরাচার এরশাদের পতনের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকা ছিল একক। সেই কঠিন সময়ে অনিশ্চিত যাত্রায় তিনি যেভাবে মাঠে ছিলেন তা বিরল ঘটনা হিসেবেই ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আর অনেকেই মনে করেন, সেই সময় তিনি শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস না করলে এরশাদের পতন হয়ে ’৯০-এর অনেক আগেই দেশ হয়তো রাহুমুক্ত হতে পারত।
সামগ্রিক বিবেচনায় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গণতন্ত্রের সংগ্রামের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। কিন্তু তাঁর এই অর্জন মোটেই সহজ ছিল না, দীর্ঘদিনে তিলেতিলে অর্জিত হয়েছে। যার বড় অংশই অর্জিত হয়েছে স্বৈরাচারের পতন ঘটানোর কঠিন সাফল্যের মাধ্যমে। যার সূচনা এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে। যদিও এরশাদ পতনের সুফল দেশবাসী বেশি দিন উপভোগ করতে পারেনি। ’৯৬ সালের নির্বাচনে অনেক কান্নাকাটি করে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু এরপর ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলেও মেয়াদের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের লীগ-বৈঠা সন্ত্রাসের ওপর ভিত্তি করে আসে ওয়ান-ইলেভেনের রহস্যজনক সরকার। এই সরকারের কারসাজিতে ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে গদি দখল করেন শেখ হাসিনা। এরপর তিনি নিজরূপে আবির্ভূত হন। ‘বঙ্গবন্ধুকন্যা’ থেকে রাজনীতিতে হয়ে যান ‘রাক্ষসকন্যা।’ ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচন এবং আরও অনেক কাণ্ড করে দেশকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। স্বৈরাচার হিসেবে তাঁর কাছে জেনারেল এরশাদ ছিলেন একেবারে শিশু। ফলে ফ্যাসিস্ট তকমাও পেয়েছেন শেখ হাসিনা। আর এই ফ্যাসিস্টকে বিদায় করার ক্ষেত্রেও প্রধান ভিত্তি ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দৃঢ়তা, আপসহীনতা ও গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে অটল থাকার প্রতীক দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবিচল অবস্থান, শালীন কথাবার্তা, মার্জিত আচরণ এবং দেশের জন্য তিনি পরিণত হয়েছেন এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে। দৃষ্টিকোণ থেকে তিনবার, নাকি তিনি তিরানব্বইবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন সেটি মোটেই মুখ্য বিষয় নয়।
এদিকে অনেকেই জানেন, ২০০৮ সাল থেকে নানাভাবে খালেদা জিয়ার ওপর অমানবিক নিপীড়ন ও নির্যাতন চলেছে। পরে যা রূপান্তরিত হয়েছে চরম নিষ্ঠুরতায়। যা তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপরও বেগম খালেদা জিয়া অটল দৃঢ়তায় দেশের সাধারণ মানুষকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়া কেবল রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সংগ্রামই করেননি, তাঁর শাসনামলে দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নেও রেখেছেন অবিস্মরণীয় দক্ষতার স্বাক্ষর। বেগম খালেদা জিয়া দাঁড়িয়েছিলেন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন, নির্যাতন, অপমান ও অপদস্থের বিরুদ্ধে। স্বামী হারানোর শোক আর সন্তানের শূন্যতায় বুকে পাথর চেপে লড়াই করে গেছেন তিনি। দীর্ঘ ছিল সেই লড়াই, ছিল অসীম যন্ত্রণার। তবু তিনি রণে ভঙ্গ দেননি। হাল ছাড়েননি, কিংবা ধৈর্যহারাও হননি। এভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন রাজনৈতিতে দৃঢ়তা ও ঐক্যের প্রতিশব্দ। এরপরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথরেখা নিয়ে আলোচনার দরজা খোলা রাখা প্রয়োজন। আর তা শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকেও ধারণ করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের বলয়ে ভারসাম্য বজায় রাখার এক বিশাল গুরুদায়িত্ব এখন বিএনপি তথা তারেক রহমানের ওপর বর্তায়।
এদিকে দায়িত্ব আছে জাতিরও। এখন খালেদা জিয়াকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করার সময় এসেছে। যদিও বছরের প্রথম দিনই এ কথা বলেছেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। নতুন বছরের প্রথম দিন খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সত্যিকার অর্থে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চাই।’ কিন্তু পর্যবেক্ষক মহলের সতর্ক বার্তা হচ্ছে, এটি যেন দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে করা না হয়। বেগম জিয়ার শোককে জাতি বিনির্মাণের শক্তিতে রূপান্তরের জন্য আন্তরিক হতে হবে। এদিকে দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া এখন সময়ের দাবি। আর এ পর্যন্ত যতটুকু হয়েছে তাঁকে সূচনাপর্ব হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। তাঁকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে কৃতজ্ঞ এই জাতির। পাশাপাশি রাষ্ট্র কাঠামোর সর্বত্র তাঁর ছবি স্থাপন করা জরুরি বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। আর বেগম খালেদা জিয়া যে ঐক্যের পাটাতন তৈরি করে গেছেন। তা অক্ষুণ্ন রেখে রাজনীতিকরা যেন ভূমিকা পালন করবেন। আর বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানই ছিল ’৯০ এবং ’২৪-এর সফলতার ভিত্তি। অভিজ্ঞজনরা মনে করেন, তাঁর আপসহীন লড়াই ছাড়া ’৯০ ও ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থান সফল হতো না।
যদিও এখন অনেকেই জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের দাবিদার। কিন্তু প্রকৃত দাবিদার হচ্ছে জনগণ। আর এই জনগণকে লড়াই করার অফুরান সাহস জুগিয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম। তিনি বিন্দুমাত্র আপস করলে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ’২৪-এ তো দূরের কথা, ’৪২-এও হতো কি না, সন্দেহ! হয়তো জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শাসনের অবসানের জন্য আরও বহু বছর জাতিকে অপেক্ষা করতে হতো।