ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত সড়কপথে চোখের পলকে পৌঁছানো
যায় না। প্রকাশিত খবর অনুসারে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে খুনিদের
অন্তত ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এই সময়টা পুলিশ-র্যাব কী
আঙুল চুষেছে! আর সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীরা…?
শহীদের মৃত্যু নেই! জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সম্মুখসমরে অকুতোভয় যোদ্ধা এবং ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির ইন্তেকালের খবর আসে বৃহস্পতিবার রাতে। এ খবর জানাতে রাত পৌনে ১০টায় ইনকিলাব মঞ্চের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলা হয়, ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ মোকাবিলায় মহান বিপ্লবী ওসমান হাদিকে আল্লাহ শহীদ হিসেবে কবুল করেছেন।’ এই ধারণার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করেও বলা চলে, হাদির মাথায় একটি মাত্র বুলেটের আঘাতে তাঁর মহান আল্লাহর দরবারে যাওয়ার ঘটনায় অসংখ্য প্রশ্ন ও প্রসঙ্গ রয়ে গেছে। যাঁকে পাখির ঝরাপালক বিবেচনা করলে মহা ভুল হবে। প্রসঙ্গত শরিফ ওসমান হাদির মাথায় সন্ত্রাসীর নিখুঁত নিশানায় বুলেট বিদ্ধ হয় ১২ ডিসেম্বর শুক্রবার। এই একটি মাত্র বুলেট দেশের সামগ্রিক নাজুক অবস্থাকে আরও অনেক নাজুক করে দিয়েছে। এলোমেলো হয়ে গেছে অনেক হিসাবনিকাশ। দেশবাসী আলোড়িত।
আন্দোলিত হয়েছে সরকারের বিভিন্ন স্তর ও স্তম্ভ। এমনকি এই বুলেটের প্রতিক্রিয়ার প্রভাব দূর দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছেছে। এদিকে সন্ত্রাসী আটকে ব্যর্থতার মুকুট পরে পুলিশ হরেক কিসিমের অসংখ্য গালগপ্প ফেঁদেই চলেছে। প্রধান শুটার হিসেবে চিহ্নিত ফয়সালের মা-বাপ, বন্ধু-স্ত্রী-সহযোগী, এমনকি প্রেমিকা থেকে শুরু করে অনেকেই পুলিশের হেফাজতে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে র্যাবেরও ভূমিকা আছে। পুলিশ এককভাবে যে ‘বিশাল’ কাজটি করেছে, সেটি খুবই হাস্যকর। তা হচ্ছে, হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত মোটর বাইকটি উদ্ধার। এ ক্ষেত্রে আমাদের পুলিশকে ‘মেধাবী’ বলতেই হবে। কারণ তারা ধরেই নিয়েছে, আসল নাম্বার প্লেট ব্যবহার করেই খুনি চক্র কিলিং মিশন চালিয়েছে। পুলিশের এই মেধার প্রশংসা না করে উপায় আছে, গোলাম হোসেন?
অবশ্য পুলিশ নিয়ে বেশি কথা না বলাই বেহেতর। কারণ জুলাই আন্দোলনের পর একই ভাঙা রেকর্ড বাজছে, ‘পুলিশ ট্রমায়’ আছে। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে, কোনো ঘটনার ট্রমা অনন্তকাল থাকে না। আর আমাদের পুলিশের তো নয়ই। এ ব্যাপারে সাধারণ ধারণা করার প্রয়োজন নেই। থানাচিত্রের দিকে নজর দিলেই বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীও বুঝতে পারবেন, ‘ট্রমার চাদর মুড়ি দিয়ে’ থানা-পুলিশ আসলে কী করছে! মনে রাখা প্রয়োজন, থানা-পুলিশই কিন্তু মূল পারফর্মার। উপরের স্তর হচ্ছে সুপারভাইজার। অধিকতর পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে নিয়োজিত। স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া খুন থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের নির্বাচন- সবকিছুই প্রাথমিকভাবে থানা-পুলিশের এখতিয়ারে। প্রশ্ন হচ্ছে-ওপরের পুলিশ কী সজাগ থাকেন? যদি সজাগই থাকতেন, তাহলে শরিফ ওসমান হাদি কিলিং মিশনের মাঠের প্রধান হিসেবে পুলিশের বয়ানে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ পালাল কীভাবে? সে তো বোরাকে চেপে যায়নি। ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো প্রথমে হেলিকপ্টারে, পরে উড়োজাহাজে চড়ে পালানোর সৌভাগ্য হয়নি খুনির। তাহলে…?
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর হচ্ছে, হাদিকে গুলি করা দুজন ময়মনসিংহ সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। শুটার ফয়সাল ও বাইক চালক আলমগীর ঘটনার দিন ১২ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ভুটিয়াপাড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে গেছে। তারা মিরপুর থেকে আশুলিয়া, পরে গাজীপুর হয়ে ময়মনসিংহে প্রবেশ করে। চলার পথে তারা একটি প্রাইভেট কারে অবস্থান পরিবর্তন করেছে। কারোই অজানা নয়, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত সড়কপথে চোখের পলকে পৌঁছানো যায় না। প্রকাশিত খবর অনুসারে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছাতে খুনিদের অন্তত ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে। এই সময়টা পুলিশ-র্যাব কী আঙুল চুষেছে! আর সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীরা…? অনেকেরই জানা, সীমান্তে চোরাচালান ও আদম পারাপার বাণিজ্য আছে। এর সঙ্গে প্রায় সব পক্ষই জড়িত থাকার বিষয়ে গণঐক্য রয়েছে। যেমন ছিল সিলেটের সাদাপাথর লুটের ঘটনায়। এসব ওপেন সিক্রেট। এরপরও প্রশ্ন হচ্ছে, খোদ রাজধানীতে এত সংবেদনশীল ঘটনার পরও পুলিশ-র্যাব ও বিজিবির হুশ হলো না কেন? নাকি বিষয়টি আমলে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো। যেমন হাদির লাগাতার আশঙ্কার কথা বিবেচনায় নেয়নি রাষ্ট্র। অথচ রাষ্ট্র উপযুক্ত সময়ে হাদির অভিযোগ-আশঙ্কা বিবেচনায় নিলে আজ হয়তো রাষ্ট্রীয় শোক পালন করতে হতো না! এসব প্রসঙ্গ কি আমরা বিবেচনায় নেব? জানা কথা, এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে না!
যেমন উত্তর অনিশ্চিত, অধস্তন বাহিনীগুলোকে দৌড়ের ওপর রাখার বদলে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ‘মৌলবি সাহেবের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন কেন? প্রসঙ্গত শহীদ হাদির শেষ নিশ্বাস ত্যাগের খবর আসে ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে দশটার দিকে। এর আগে বিকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছিলেন, ‘আপনারা সবাই ওসমান হাদির জন্য “খাস” দিলে দোয়া করুন। যদি সবাই দোয়া করেন, হাদি নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। এখন তার জন্য দোয়া খুবই জরুরি।’ বলাবাহুল্য দোয়ার অসীম ফজিলত নিয়ে কারও কোনোই দ্বিমত নেই, থাকার কথাও নয়। কিন্তু এই দায়িত্ব তো স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার হওয়ার কথা নয়। যেমন তাঁর দায়িত্ব নয়, নির্বাচনে প্রার্থীদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া।
এ বেফজুল আওয়াজের আগে তিনি একটু ভেবে দেখেছেন কী, লাইসেন্স করা অস্ত্র দিয়েও আততায়ীর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় না। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার দায়িত্ব কী দোয়ার আহ্বান জানানো, নাকি খুন ঠেকানো এবং অপরাধীদের ধরা? কোনোই সন্দেহ নেই, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজে ধরবেন না, ধরবে তাঁর নিয়ন্ত্রণে থাকা হরেক কিসিমের বাহিনী। যারা রাষ্ট্রের অর্থে লালিতপালিত হন। বিপ্লবী হাদির মৃত্যুর ঘটনা কেবল নয়, সামগ্রিক বিবেচনায়ই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ভালো বলার উপায় নেই। কিন্তু এ বিষয়টি কি কেবল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা উপদেষ্টার ওপর নির্ভর করে? নিশ্চয়ই না। এর সঙ্গে অসংখ্য ফ্যাক্টর সম্পৃক্ত। কিন্তু দোষ চাপে কেবল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ওপর! দোষারোপ করার এ ধারা সাধারণ মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে কথা ছিল। কিন্তু তা থাকছে না। বরং যারা বোদ্ধা অথবা বোদ্ধা হিসেবে বচন যোদ্ধা, তারাও কথায় কথায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেন। কিন্তু তারা সুগভীরে তো দূরের কথা, সাধারণ গভীরেও যান না। গভীরের যে কথা বলে গেছেন মেধাবী রাজনীতিক কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন। তাঁর ভাষ্য, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কখনো নিজে মন্ত্রী থাকেন না।’ এ কথা আকবর হোসেন বলেছিলেন শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর রফিক প্রসঙ্গে। যাক সে অন্য প্রসঙ্গে। মূল কথা হচ্ছে, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ কোনো সমাধান নয়। এ ব্যাপারে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ১৫ আগস্ট যথার্থই বলেছেন, ‘আজকে অনেকের পদত্যাগের দাবি উঠেছে। আমরা তাদের অনুরোধ করব, আপনারা পদত্যাগ নয় বরং দায়িত্ব পালনের যোগ্য-এটা প্রমাণ করুন। যদি করতে ব্যর্থ হন, মনে রাখবেন, ৫ আগস্ট বারবার ফিরে আসবে। কিন্তু এটা আমাদের কামনা নয়।’ নিঃসন্দেহে এটি গভীরের কথা।
তবে অসীম গভীরের কথাটি বলেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হাদির মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ ডিসেম্বর রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছেন, ‘এই শোকের মুহূর্তে আসুন, আমরা শহীদ শরিফ ওসমান হাদির আদর্শ ও ত্যাগকে শক্তিতে পরিণত করি। ধৈর্য ধারণ করি, অপপ্রচার ও গুজবে কান না দিই এবং যে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকি।
যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায়, তাদের ফাঁদে পা না দিয়ে আসুন আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে অবিচল পদক্ষেপে এগিয়ে যাই। এটাই হবে শহীদ হাদির প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।’ বলাবাহুল্য, বিরাজমান বাস্তবতায় এর চেয়ে মৌলিক কথা আর হতে পারে না। আরও একটি মৌলিক বিষয় খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল ২০২৪ সালে জন-আকাঙ্ক্ষা সফল হওয়ার পর। সেটি হচ্ছে বিজয়ীদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখা। যা হয়নি। বরং বিরোধ কখনো কখনো ন্যক্কারজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারও কারও মতে, এই বিরোধকে আরও কয়েক ধাপ উসকে দেওয়ার জন্য যেসব ব্লু প্রিন্ট বাস্তবায়নাধীন রয়েছে এরই একটি হচ্ছে বিশুদ্ধ বিপ্লবী হাদির মাথায় অব্যর্থ নিশানায় একটি বুলেট বিদ্ধ করা। হাজারো মানুষের রক্তের দাগ না শুকাতেই পরাজিত ষড়যন্ত্রকারী চক্র এত দ্রুত আঘাত হানার সাহস পেয়েছে-বিজয়ীদের মধ্যে অনৈক্যের ওপর দাঁড়িয়ে। সূত্র আছে, ষড়যন্ত্রকারীরা প্রতিপক্ষের অনৈক্যকে উদ্দেশ্য হাসিলের স্বর্ণদ্বার হিসেবে বিবেচনা করে।
এদিকে বিপ্লবী হাদির চির বিদায়ে শোকের মধ্যেও একটি বিষয় খুবই উদ্বেগের বলে ধরে নিতে হবে। তা হচ্ছে নিরাপত্তার অভাব বোধ করে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত মাসুদুজ্জামান মাসুদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মাসুদদের সংখ্যা বাড়তে পারে। অসংখ্যও হতে পারে। তখন আমাদের দেশে কোন মডেলের নির্বাচন হবে? সময়ই তা বলে দেবে। তবে এটুকু বলা চলে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে কেবল ’২৪-এর অর্জন নয়, ’৭১-এর অর্জনও ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পরে।
# বাংলাদেশ প্রতিদিন-এ প্রকাশিত, ২০ ডিসেম্বর ২০২৫। শিরোনাম, “ হাদির মাথায় একটি বুলেট, অসংখ্য প্রশ্ন”