• ২১শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সালাম ও মোদাব্বিরকে চিনি, চিনি ভানুকেও

দখিনের সময়
প্রকাশিত নভেম্বর ৪, ২০২৫, ২০:০৪ অপরাহ্ণ
সালাম ও মোদাব্বিরকে চিনি, চিনি ভানুকেও
সংবাদটি শেয়ার করুন...
আলম রায়হান:
আমার বিবেচনায়, সাংবাদিক হয়ে রাজনীতির খুচরা কর্মী হবার বিষয়টি মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এরপরও সাংবাদিক মোদাব্বির হোসেনের বুকে বিএনপি নেতা আবদুস সালামের কনুইর গুতায় খুবই ব্যাথিত হয়েছি। এ ঘটনায় ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি রাগ

# ড্রইং রুমের দরজা ঠেলে দাঁড়াতেই

হাহা করে হেসে উঠলেন কর্নেল মালেক।

বললেন, ‘আসেন আসেন,

আলম রায়হান। আজ হবে পান আর গান।’

নিবারনের চেষ্টা করেছি, “সাংবাদিক হইয়া রাজনীতির কর্মী হস ক্যান, খুচরা নেতার গুতাই বা খাস ক্যান..।”
প্রকৃতিতে উপকারী নানান উপাদানের মতো মিডিয়া অঙ্গনে খুবই উপকারী ব্যক্তিত্ব নঈম নিজামের পোস্ট থেকে জেনেছি, ইউনিয়ন করলেও মোদাব্বির হোসেন নিয়মিত অফিস করতেন। এদিকে আমিও তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি। আমরা ঘনিষ্ঠ। খুবই স্বজ্জন মানুষ। আমরা একত্রে দৈনিক নভঅভিযানে কাজ করেছি। সম্ভবত কাজ করেছি বাংলার বাণী অথবা দৈনিক দিনকালে। দৈনিক দিনকালে যোগদান করার পর তিনি আমাকে নিজ উদ্যোগে কিছু সুপরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, সাবধান! এই হাউজ কিন্তু খুবই জটিল! সম্ভবত গুতাগুতি প্রবণ দৈনিক দিনকালে আমার অবস্থান নিয়ে তিনি এক ধরনের শংকায় ছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন না, দিনকালে আমার যোগদান হয়েছিলো খোদ তারেক রহমানের মাধ্যমে, চট্রগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ জিন্নার সুপারিশে। তিনি ছিলেন এই পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা মালিক, সম্পাদক জমির আলী। সিভি দেখে তারেক রহমানের মৃদু প্রশ্ন, ‘আপনি বাংলার বাণীতে ছিলেন?’ আমি কেবল, ‘জী’ বলে উত্তর শেষ করেছি। তিনি আমার সিভি ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সিরাজ ভাইর কাছে পাঠিয়ে দিলেন। শুরু হয় দৈনিক দিনকালে আমার নয় মাসের চাকুরী জীবন। সেই সময় প্রতি সন্ধ্যায় দিনকালে বেতন প্রসঙ্গ নিয়ে সাংবাদিকদের মিটিং হতো। এ মিটিং-এ সবচেয়ে জোরালো বক্তব্য রাখতেন গণী চৌধুরী। তখনই তিনি মস্ত বক্তা ছিলেন। এখন তিনি বহুধা বিভক্ত সাংবাদিকের এক অংশের বিশাল নেতা। কিন্তু দিনকাল আর কোন অর্থেই বিশাল হতে পারলো না। অথচ এই পত্রিকার কান্ডারী হয়েছেন খোদ তারেক রহমানসহ অনেক বিশিষ্ট জন। এমনকি এরশাদের বান্ধবী জিনাতের স্বামী মোশাররফ হোসেনও ছিলেন। এখন আছেন ত্যাগী রাজনীতিক শিমুল বিশ্বাস। কিন্তু দিনকাল সেই মরণ দশার ধারাই ধরে রেখেছে।
দিনকাল প্রসঙ্গ থাক। আবদুস সালাম প্রসঙ্গে আসি। তার সাথে আমার পরিচয় সাপ্তাহিক সুগন্ধা সূত্রে, কর্নেল মালেক সূত্রে ঘনিষ্ঠতা। তখন কর্নেল মালেক ঢাকার মেয়র। আর একাধিক ডিপুটি মেয়রের মধ্যে আবদুস সালামও ছিলেন। কিন্তু এরশাদের শাসন ব্যবস্থা তো ছিলো জগত সংসারের মতোই! সবকিছুই অস্থায়ী, নশ্বর। এই ধারায় মেয়রগিরী নাজিউর রহমান মঞ্জুরের হাতে তুলেদিয়ে কর্নেল মালেক পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী হলেন। কিন্তু দ্রোপদির বস্ত্র হরণের মতো তাঁর মন্ত্রিত্ব হরণেও বেশি সময় নেননি জেনারেল এরশাদ। একইদিন

# দিনকালে আমার যোগদান হয়েছিলো খোদ তারেক রহমানের

মাধ্যমে, চট্রগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ জিন্নার সুপারিশে। সিভি দেখে মৃদু প্রশ্ন করেছিলেন

তারেক রহমান, ‘আপনি বাংলার বাণীতে ছিলেন?’

আমি কেবল, জী বলে উত্তর শেষ করেছি।

মইদুল ইসলাম মুকুলেরও মন্ত্রীত্বের চাকরি গিয়োছিলো।জনাব মুকুলকে কিছুটা চিনতাম। তাঁর আসাদ গেটের বাসায় জাগপা’র শফিউল আলম প্রধান একবার নিয়ে গিয়েছিলেন দৈনিক দেশ-এ চাকরীর জন্য। সিভি দেখে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করতে বললেন জনাব মুকুল। সম্পাদকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন আলী মামুদ ভাই। কিন্তু দৈনিক দেশে আমার চাকরী হয়নি। মানে মালিক কানেকশনে আগে পত্রিকায় নেয়ার বিষয়টা আজকের মতো ডালভাত ছিলো না। যে অভিজ্ঞতা আমার পরে আবার হয়েছে বৈশাখী টেলিভিশনেও। একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে খবর দিয়ে শওকত মাহমুদকে ফোন করে আমাকে নিতে বলেছিলেন মির্জা আব্বাস। কিন্তু ইন্টারভিউ নেবার নামে ঘন্টাখানেক নানান খাজুরে আলাপ হয়েছে কেবল। বৈশাখী টেলিভিশনে আমার চাকরী হয়নি। এরপর শওকত ভাইর সঙ্গে বহুবার দেখা হয়েছে। কথাও হয়েছে। কিন্তু পুরনো প্রসঙ্গ তুলিনি। যেমন ঘরোয়া গানের অনুষ্ঠানে পেয়েও মইদুল ইসলাম মুকুলকে পুরনো প্রসঙ্গটি মনে করাইনি। জীবনান্দ দাসের কবিতা আছে, ‘কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে…’
মন্ত্রিত্ব হারা কর্নেল মালেককে শান্তনা দিতে তার বাসায় গিয়েছিলাম রাত দশটার দিকে। পুরো বাড়ি ছিলো ফাঁকাফাঁকা। আগের তুলনায় ভুতুরে! অথচ আগে পুরো বাড়ি লোকে লোকারণ্য থাকতো। এ ব্যাপারে কর্নেল আকবরের বানীসম একটি মন্তব্য আছে, ‘মন্ত্রী থাকাকালে সুস্থে বাথরুমেও যাবার উপায় নাই, লোক ঢুকে পড়ে। মন্ত্রীগিরি গেলে কুত্তাও আসে না!’
ঐ দিন কর্নেল মালেকের বাসায় চারপাঁচ জনের বেশি লোক ছিলো না। এর মধ্যে একজন ছিলেন উপজেলা চেয়ারম্যান, সম্ভবত মানিকগঞ্জের। তিনি আমাকে চিনতেন। বললেন, ‘একটু দেখে রুমে যাইয়েন।’ ড্রইং রুমের দরজা ঠেলে দাঁড়াতেই হাহা করে হেসে উঠলেন কর্নেল মালেক। বললেন, ‘আসেন আসেন, আলম রায়হান। আজ হবে পান আর গান।’

# একজন সাংবাদিকের মাধ্যমে আমাকে পূর্ত মন্ত্রণালয়ে

ডেকে শওকত মাহমুদকে ফোন করে আমাকে নিতে

বলেছিলেন মির্জা আব্বাস।

কিন্তু বৈশাখী টেলিভিশনে আমার চাকরী হয়নি।

বিশাল ড্রইং রুমে লোক ছিলো মাত্র চারজন। কর্নেল মালেক, মইদুল ইসলাম মুকুল, আবদুস সালাম ও তার স্ত্রী ভানু। ভানু অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন এবং খুবই মার্জিত রুচির। আমার ধারণা ছিলো, মন্ত্রিত্ব হারিয়ে কর্নেল মালেক বিমর্ষ হয়ে পড়বেন। কিন্তু দেখলাম পুরো উল্টো। তাঁকে আগের মতোই ফুরফুরা মেজাজে মনে হলো। প্রসঙ্গত, তিনি ছিলেন জেনারেল খালেদ মোশারফের ক্যূ’র সেকেন্ড ইন কমান্ড। বঙ্গভবন থেকে বের হতে কিঞ্চিত দেরী হওয়ায় অপঘাতে মৃতুর হাত থেকে বেঁচেছেন।
মন্ত্রিত্ব হারিয়ে কর্নেল মালেক বিমর্ষ হবেন- পূর্বের এ ধারণা কেটে গেলো। কিন্তু গান প্রসঙ্গে সংশয় থেকেই গেলো। ভাবলাম, পান তো বুঝলাম, কিন্তু গান কিসের! প্রসঙ্গত, ড্রইং রুমে পানের ডিব্বা নিয়ে বসতেন কর্নেল মালেক। রাত যত গভীর হতো তার গল্প ও পান খাওয়া ততই বাড়তো। অইদিনও এমনটাই চলবে বলে ভেবেছিলাম। কিন্তু রাত বারোটার দিকে গানের বিষয়টি পরিস্কার হলো। লটবহর নিয়ে এক যুবতীকে ঢুকতে দেখলাম। মইদুল ইসলাম মুকুল বললেন, ‘হাই বেবী।’ ভালো করে তাকিয়ে বুঝলাম বেবী নাজনীন। পরে শুনেছি মুকুল সাহেব খুবই গান রসিক। তার আসাদগেটের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসতো। সেখানে রুনা লায়লাও গান করেছে। এবং মোটা অংকের পারিশ্রমিক ছাড়াও শিল্পীদেরকে স্বর্নের কয়েন দিতেন মইদুল ইসলাম মুুকুল। আরো অনেক কিছু শুনেছি ড.

গাড়ির কাছে এসে ভানু ভাবী বললেন,

সালাম তুমি পিছনে

বসো। আলম ভাই সামনে

আসেন, আমি গাড়ী চালাই।

মোশাররফ স্বাস্থ্যমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর এপিএস’র কাছে। তিনি আগে মইদুল ইসলাম মুকুলের এপিএস ছিলেন। অবশ্য আগিলা জমানায় এপিএসদের এতো কান্ড চাউড় হতো না। আলিশান তিন সিটের সোফায় আমি বসলাম আবদুস সালামের বাম পাশে। ডানে ছিলেন তার স্ত্রী ভানু। এদিকে বেবী নাজনীনের সাঙ্গাতরা টুং-টাং শব্দে যত্রপাতি পরীক্ষা করছিলেন। বেশ ভালো লাগছিলো। কিন্তু গরম ভাতে ঠান্ডা জল ঢেলে দেবার অবস্থা করলেন আবদুস সালাম। তিনি বললেন, ‘বাসায় যাবেন?’ বুঝলাম, আমার উপস্থিতিতে হুজুরের বিরক্তি উদ্রেক হচ্ছিলো। দাঁড়িয়ে কর্নেল মালেককে বললাম ‘স্যার, আজ আমি আসি।’ তিনি বললেন, ‘কিসের আসি, বসেন!’ তিনি আবার বললেন, ‘আজ হবে গান আর পান।’
ব্যাস্ এবার আমি বেশ জেঁকে বসলাম। পাশের আবদুস সালামকে একটু অসহায় মনে হলো। অথবা এটি ছিলো আমার বিভ্রম। প্রায় ঘন্টা খানেক এটাওটা করার পর বেবী নাজনীনের গান শুরু হলো। সবাই জানে অসাধারন কন্ঠ এবং গায়কী তাঁর। কিন্তু সেই মাত্রায় মুল্যায়ন হলো না। অথচ দাদাদের দেশ থেকে অনেক গুণ নীচের শিল্পী আসলে পুরো দেশ যেনো মাথায় নিয়ে নাচতো। যা এখন চলছে পাকিস্তানের শিল্পীদের নিয়ে। কিন্তু দেশী শিল্পীদের অবস্থা চিরকালই গেয়ো যোগীর মতো। প্রবচন আছে, ‘গেয়ো যোগী ভাত পায় না।’
ফজরের আজানের সঙ্গেসঙ্গে গান বন্ধ হলো। ভাংলো আসর। কর্নেল মালেক আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আপনি কীভাবে যাবে, গাড়ী আছে? কোন পস না দিয়েই বললেন, সালাম তুমি সাংবাদিককে বাসায় নামিয়ে দেবে। আমি বেশ মজা পেলাম। কিন্তু তখন তো জানি না, সামনে আরো মজা আছে। গাড়ির কাছে এসে ভানু ভাবী বললেন, সালাম তুমি পিছনে বসো। আলম ভাই সামনে আসেন, আমি গাড়ী চালাই।
আমি ভেবেই পাই না, এমন একটি আন্তরিক ও উদার পরিবারের মধ্যে থেকেও আবদুস সালাম কিভাবে এতোটা উগ্র আচরণ করলেন! নাকি তার মধ্যে অতীতের জাসদীয় উত্তেজনার রাজনীতির হঠাৎ উদ্রেক হয়েছিলো? নাকি ক্ষমতায় দোড়গোয়ার থাকার বিভ্রমে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন। বিএনপির ক্ষমতায় যাওয়া প্রসঙ্গে একটি কবিতার লাইন উল্লেখ করা যায়, ‘তোমার গালে সুন্দর তিল দেখে ছুঁতে গেলেই উড়ে গেল মাছি।’ এখন দুটি প্রশ্ন। এক. এই কবিতাটি কার? দুই. বিএনপি ক্ষমতায় যাবে? আরো একটি খুচড়া প্রশ্ন আছে, আবদুস সালাম বিএনপির মনোনয়ন পেলেন না কেন?