আমাদের উন্নয়নধারণা কতটা অসার তা বোঝাগেল সরকারের লকডাউন ঘোষনার পর। এক সপ্তাহ চলার মতো সঞ্চয় নেই অধিকাংশ মানুষের। এটা বুঝতে পেরে জীবন বাঁচানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে জীবিকার জন্য পথ করে দিতে হল। মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য উন্নয়ন, নাকি জীবন সাজানোর জন্য- এই প্রশ্নের মুখোমুখি এখন সরকার। উন্নয়নের রাজনীতিতে উন্নতির ইন্ডিকেটর হিসেবে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার, মাথাপিছু আয়, ফ্লাইওভার, দীর্ঘ সেতু, টানেল-আন্ডারপাসকে বিবেচনায় নিয়ে আত্মতুষ্টি দেশের মানুষের জীবনে কতটা ভূমিকা রাখছে তা যাচাই করার পরীক্ষা এখন সরকারের সামনে।
করোনার এই দিনগুলোতে দেশের এই উন্নয়নের ইন্ডিকেটরে কোটিপতির সংখ্যাবৃদ্ধি দ্রুততর হচ্ছে বটে। কিন্তু তাদের অবস্থান রক্ষার জন্যও গুনতে হচ্ছে প্রণোদনার নামে ভর্তূকি। এই ভর্তূকি কোন কাজে আসছে সে বিষয়ে আজ যেতে চাই না। কিন্তু প্রসঙ্গটা আসছে উন্নয়নের দর্শণে দেশ আজ যে ঘাটতিতে পড়েছে সেটা মেটাতে এই টাকাটার আজ বড্ড দরকার।
অক্সিজেনের জন্যে ভারতের হাহাকার সেখানে ভয়াবহ করুণ অবস্থার জন্ম দিয়েছে। নীরব দর্শক হয়ে তা দেখার সময় আমাদের হাতে নেই। ভারত সরকার তার জনগণকে রক্ষা করতে প্রয়োজনে অন্যের প্রতি নিষ্ঠুর হবে বা হচ্ছে এটাই স্বাভাবিক। এনিয়ে তাদের দোষারোপ করে প্রতিকার পাওয়া যাবে এটা তেমন সময় নয়। তারা টিকার জন্য চুক্তি করে সরবরাহ বন্ধ করেছে। অক্সিজেন রফতানি বন্ধ করেছে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম- সেই মরণ বাঁচন পরিস্থিতিতে পড়ে।
আমাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে ভারতের এই তৃতীয় ভাইব্র্যান্টের করোনা ভাইরাস। আল্লাহ না করুন অক্সিজেনের চাহিদা যদি আমাদেরও হঠাৎ বেড়ে যায় তাহলে কী হবে? দেশে মাত্র তিনটি কোম্পানি অক্সিজেন উৎপাদনকরে। যার সিংহভাগ উৎপাদন করে লিন্ডে বিডি নামের বহুজাতিক কোম্পানি। এই লিন্ডের ভারতীয় কোম্পানিটির একাধিক প্লান্ট আছে পশ্চিমবঙ্গে। বাংলাদেশের লিন্ডে কোম্পানি টু কোম্পানি চুক্তির আওতায় ভারতীয় প্লান্ট থেকে চাহিদামতো অক্সিজেন আমদানী করে। ভারত সরকার অক্সিজেন রফতানি বন্ধ করে দেয়ায় এখানে সরবরাহে ঘাটতি পড়ল।
আমাদের জীবন সাজানোর উন্নয়ন নীতি এমন অবস্থা দেশে তৈরী করেনি যাতে ইচ্ছে করলেও রাতারাতি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। অক্সিজেনের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়ে ভাবাভাবির সময় এখন আর হাতে নেই। ভারত সরকার জরুরিভাবে অক্সিজেন আমদানির ব্যবস্থা নিয়েছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করে শুধু মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদন করতে অক্সিজেন কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে। সরাসরি বাতাস থেকে অক্সিজেন আহরণ করে সাপ্লাই দিতে সক্ষম এমন দু’ডজন মোবাইল অক্সিজেন প্লান্ট জার্মানি থেকে আমদানি করছে।
আমাদের জন্য এখন দুটো পথ খোলা। প্রণোদনার নামে তেলা মাথায় তেল দিতে ভর্তূকি বন্ধ করা। সেসব টাকা একত্র করে দ্রুত অন্যত্র থেকে অক্সিজেন আমদনির ব্যবস্থাসহ যতগুলো সম্ভব স্থানান্তর যোগ্য অক্সিজেন প্লান্ট সংগ্রহ করা। যা দিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা যাবে। এজন্য কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্ট ক্রয়ের ক্ষেত্রে যেমন আইনি ছাড় দেয়া হয়েছিল প্রয়োজন সে আইনের আওতায় এই ক্রয় করা।
বড় বড় অবকাঠামো তৈরির উন্নয়নের চেয়ে আধুনিক হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, আর অক্সিজেন প্লান্টসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উচ্চ হিমাংকের সংরক্ষণাগার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উন্নয়ন না করার খেসারত যেন লাখো নাগরিকের জীবন দিয়ে গুনতে না হয় সেদিকে নজর দেয়া এখন সময়ের দাবী।