জামায়াতের হাইড্রোলিক প্রেসারে বিএনপি, নির্বাচনে বিজয় কুয়াশাচ্ছন্ন
দখিনের সময়
প্রকাশিত নভেম্বর ২৫, ২০২৫, ১৯:৩৫ অপরাহ্ণ
সংবাদটি শেয়ার করুন...
আওয়ামী লীগের ভোটারদেরকেও কাছে টানার চেষ্টা করছে জামায়াত।
এ জন্য নানান মানবিক কৌশল গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে,
পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগারদের রাড়িতে রাতের আধারে চালের
বস্তাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাঠানো।
আলম রায়হান:
একদা রাজনীতিতে ছোট ভাইসম জামায়াত ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির জন্য মহা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগ শূন্য মাঠে গোল দেবার স্বপ্নে বিভোর বিএনপি এখন জামায়াতের হাইড্রোলিক প্রেসারে আছে। এদিকে অন্যান্য বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আগামী সম্ভাব্য সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের সম্ভাবনা কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে বলে ধারণা পর্যবেক্ষক মহলের। এদিকে কারোকারো মতে, ১/১১-এর টু-মাইনাস ফর্মূলা কখনো পরিত্যক্ত হয়নি। বরং ২৪-এর ৫ আগস্টের আগে-পরে দ্বিতীয় অধ্যায় বাস্তবায়নের কাজ অধিকতর জোরদার হয়েছে!
অনেকেরই জানা, রাজনীতির এডাল-ওডাল, সড়ক-মহাসড়ক, গলি-চিপাগলি হয়ে জামায়াত একেবারে বিএনপির ঘরে ঢুকে পড়েছিলো। আর কেবল এডাল-ওডাল নয়, এ কথা-সেকথা, এমনকি আকথা-কুথাও বলছে জামায়াত। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, এসবের মূল লক্ষ নির্বাচন বিলম্বিত করা। তবে কেবল এই লক্ষে স্থির হয়ে বসেথাকেনি জামায়াত। বরং নিয়েছে জোর নির্বাচনী প্রস্তুতিও। নানান পরিচয়ের জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা নিরন্তর নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন নারীরা। এরা বহু বছরধরে ‘তালিমের’ ছদ্মাবরণে সংগঠিত হয়েছেন। ভোটের রাজনীতিতে এই তালিম গ্রুপের নারীরা এখন জামায়াতের বিরাট শক্তি। বলাই তো হয়, ‘নারীশক্তি অসীম!’
সবারই জানা, রাজনীতিতে কিছু দিন আওয়ামী লীগের দোসর হিসেবে পথ চললেও দীর্ঘ সময় বিএনপির ছোট ভাই হয়েই ছিলো জামায়াত। কারোকারো বিবেচনায়, রবি ঠাকুরের কবিতার ‘কেষ্টা বেটার’ মতোই। কিন্তু সেই জামায়াত এখন বিএনপিকে ল্যাগং মারার তালে আছে। এই লক্ষেই নানান বলে বলিয়ান জামায়াত বিএনপির মুখোমুখি দাড়িয়েগেছে। নির্বাচনে মাত্র তিন আসনের সক্ষমতা থাকার পরও বিএনপির দয়া অথবা ভুল সিদ্ধান্তের ফলশ্রুতিতে জাতীয় সংসদে ১৮টি আসন পেয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চমক সৃষ্টি করেছিলো স্বাধীনতা যুদ্ধে বিপক্ষে থাকা দলটি। শুধু তাই নয়, ২০০১-এ বিএনপি সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণায় বাগিয়েছিলেন জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা। এই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোন অভিযোগ কখনো ওঠেনি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জামাতীয় দুই মন্ত্রী ধোয়া তুলসিপাতা ছিলেন! বরং সরকারি ক্ষমতা প্রায় পুরোটাই দলীয় স্বার্থে অপব্যবহার করেছেন। গণহারে শিবিরের কর্মীদেরকে সরকারী চাকুরীতে ঢুকিয়েছেন। এরা দলের প্রতি প্রশ্নাতীতভাবে অনুগত, দলীয় ফান্ডে মাসিক হিসেবে নিয়মিত বিরাট অংকের অর্থের যোগানদাতা।
পর্যবেক্ষরা বলছেন, জামায়াতের নানানমুখি চাপে বিএনপি দিশাহারা। আর শুধু জামায়াতের চাপে নয়, রাজনীতির প্রশ্নে সিদ্ধান্ত নিতেও প্রায়ই বিএনপি দিশা হারায় বলে মনেকরা হয়। যেমন ১৩ নভেম্বর জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে ‘নোট অব ডিসেন্টের’ উল্লেখ না থাকা, সংসদের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে পিআর পদ্ধতি বাস্তবায়নের ঘোষণা এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জুলাই সনদ কার্যকরের আদেশ জারি- এই তিন ইস্যুতে দিনের বেলা বিএনপির কঠোর সমালোচনা শোনা যায়। কিন্তু রাতেই দলের অবস্থান পাল্টে যায়। গণভোটের ঘোষণাকে স্বাগত জানায় ক্ষমতার স্বপ্নে বিভোর সাবেক শাসক দলটি। বিএনপি বলেছে, ‘আজ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচনের তারিখ পুনর্ব্যক্ত করায় এবং গণভোটের ঘোষণা দেওয়ায় বিএনপি তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
বিএনপির এই কান্ডের সপ্তাহখানেকের মধ্যে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর এক কান্ড করে বসলেন। তিনি ২২ নভেম্বর প্রথমে খোটা দিয়েছেন এবং পরে মহা আজগুবি এক কথা বলেছেন। খোটাটি হচ্ছে, ‘জামায়াত ইসলামী রাজনীতিতে দাঁড়াতে পারছিলো না। জিয়াউর রহমান সেই সুযোগ করে দিয়েছিলেন। এরপর আমরাও তাদের কাজ করেছি।’ কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক শাসনের লেবাস পরার জন্য জেনারেল জিয়াউর রহমানের একাধিক রাজনৈতিক দল প্রয়োজন ছিলো। এ ব্যাপারে তিনি খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। যে কারণে ৭৫-এর থিংট্যাংকের কারসাজিতে পতিত আওয়ামী লীগকেও প্রকাশ্য রাজনীতির বৃত্তের মধ্যে এনেছিলেন। মোদ্দা কথা হচ্ছে, কাউকে দয়া করার জন্য নয়, রাজনীতির বাস্তবতার আলোকেই আওয়ামী লীগ-জামায়াতসহ সকল দলকে সুযোগ দিয়েছিলেন জেনারেল জিয়া। এমনকি গলাকাটা রাজনীতির ধারক মোহাম্মদ তোহাকেও আন্ডার গ্রাউন্ড থেকে মহান জাতীয় সংসদে নিয়েছেন বিচক্ষণ জিয়া।
আর জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে মির্জা ফখরুলের মহা আজগুবি কথাটি হচ্ছে, ‘গত দশ বছরে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে দলটি দৃশ্যমান কোনো কাজ করেনি।’ বিষয়টিকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু আসলে দুর্ভাগ্য হচ্ছে জনাব ফখরুলের হাস্যকর উচ্চারণ। কারণ সবাই জানেন, হাসিনা পতনের প্রকাশ্য ও নেপথ্যে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হচ্ছে জামায়াত। পর্যবেক্ষক মহল জানেন, ফেসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন সম্ভব করার ক্ষেত্রে এন্টি আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রধান ছিলো জামায়াত। আর বিএনপি ৩ আগস্ট পর্যন্ত দোটানায় ছিলো। হাসিনার পলায়নের পর প্রথমে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এবং পরে একক কৃতিত্ব নেবার চেষ্টা করেছে বৃহত্তম দলটি। কিন্তু বিএনপি’র এ দাবি হালে পানি পায়নি। এদিকে ৫ আগস্টের পর তৃণমূলে বিএনপির চাঁদাবাজী ও দখল বানিজ্যের তান্ডবে জনগণের মন থেকে অনেকটাই দ্রুত দূরে সড়ে যেতে থাকে বিএনপি। আরো অনেক খেলার বিরূপ প্রভাবে বিএনপি এমন এক পর্যায়ে পৌছেছে যাতে অধ্যাপক ইউনূসের খুবই ‘অনুগত’ হওয়া ছাড়া বিএনপির আর কোন পথ নেই বলে মনে করা হয়। ফলে ব্যবসা পরিবর্তনের সাইনবোর্ড টানানো দোকানের মতো রাজনীতিতে ছাড় দেয়া ছাড়া আর কোন পথ পাচ্ছে না সাবেক শাসক দলটি। বিষয়টি নগ্নভাবেই স্পষ্ট হয়েগেছে রাজিনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপির এই মাজুল দশারই পুরো সুযোগ নিচ্ছে কাক-চতুর জামায়াত। এটি বিএনপির জন্য একটি বড় বিপদ। এই বিপদ আরো বেড়ে গেছে জামায়াতের কৌশলগত রাজনীতিরে কারণে। আওয়ামী লীগের ভোটারদেরকেও কাছে টানার চেষ্টা করছে জামায়াত। এ জন্য নানান মানবিক কৌশল গ্রহন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগারদের রাড়িতে রাতের আধারে চালের বস্তাসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য পাঠানো।
বিরাজমান সামগ্রিক বাস্তবতায় অনেকেরই ধারণা, বিএনপির উপর নির্ভরশীল পরগাছার মতো এতো দিনের জামায়াত বিএনপিকেই পরগাছার দিকে নিয়ে যাবার পথে হাটছে। এ কারণে বিএনপি যত ছাড়ে জামায়াত ততই চেপে ধরে। আরো অনেক বাস্তবতার আলোকে আগামী সংসদ নির্বাচনে কোন পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে সাবেক শাসক দল বিএনপিকে- এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঙ্গে আর একটি প্রশ্ন তো প্রধান হয়ে থেকেই যাচ্ছে। তা হচ্ছে ঘোষণা অনুসারে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে তো? পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন, কোন কারণে ফেব্রুয়ারিতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হলে দেশ বড় রকমের বিপর্যয়ে পড়ার আশংকা প্রবল। এতে দেশের বড় রকমের ক্ষতি হবে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বিএনপির। আর রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হবে জামায়াত।