• ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

উপমহাদেশের প্রথম সিনেমা নির্মাতা মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন

দখিনের সময়
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৭:২৪ পূর্বাহ্ণ
উপমহাদেশের প্রথম সিনেমা নির্মাতা মানিকগঞ্জের হীরালাল সেন

CREATOR: gd-jpeg v1.0 (using IJG JPEG v62), quality = 80

সংবাদটি শেয়ার করুন...
দখিনের সময় ডেস্ক:
টাইমস অব ইন্ডিয়ায় একটি খবর প্রকাশিত হয় ১৮৮৭ সালে। বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড কোম্পানির উদ্যোগে ‘রামপাট থেকে হুগলিতে সূর্যাস্ত’ নামক একটি ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক জেতেন ২১ বছর বয়সী এক যুবক— নাম তার হীরালাল সেন। মানিকগঞ্জে জন্ম নেয়া এই যুবক ছিলেন অখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী। তার ক্যারিজম্যাটিক ফটোগ্রাফি তাক লাগিয়ে দেয় প্রতিযোগিতার বিদেশি বিচারকদের। তাদের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে। পরে জাস্টিস ম্যাকলেনের উপস্থিতিতে হীরালালকে প্রমাণ করতে হয়– ছবিগুলো তার তোলা। ম্যাকলেন এতোই মুগ্ধ হন যে, হীরাকে আরও একটি স্বর্ণ দ্বারা মুড়িয়ে দেন। এই প্রতিযোগিতায় পরপর সাতবার ছবি তুলে স্বর্ণপদক জেতার রেকর্ড গড়েন হীরালাল। উপমহাদেশের রাজনীতি থেকে খেলার ময়দান, সব ক্ষেত্রেই ছিল বাঙালিদের অনন্য পদচারণা। শিল্প-সাহিত্য বিশেষত চলচ্চিত্রও তার ব্যতিক্রম নয়। এই ভূখণ্ডে সিনেমার শুরুটা হয়েছিল একজন বাঙালি যুবকের হাত ধরে। আপনি এতক্ষণে বুঝে গেছেন, কী তার নাম, হীরালাল সেন।
১৮৮৯ সালে থমাস আলভা এডিসন চলমান ছবি দেখার প্রথম দিককার যন্ত্র কিনেটোস্কোপ আবিষ্কার করেন। ধীরেধীরে চলচ্চিত্র প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ে দেশ থেকে দেশে। ধারাবাহিকভাবে আসে বায়োস্কোপ, সিনেমাটোস্কোপ যন্ত্র। চলমান ছবির চাঞ্চল্যকর বিষয়টি আলোড়ন তোলে হীরালালের মনে। জীবনের গন্তব্য ঘুরে যায় ফটোগ্রাফি থেকে বায়োস্কোপের দিকে। মায়ের থেকে ৫ হাজার টাকা নিয়ে এক মার্কিন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে পুরোনো প্রোজেক্টর কেনেন। হীরালালা ছবি দেখাতেন মাঠে-ময়দানে তাঁবু খাটিয়ে, ছবি দেখাতেন থিয়েটার হলের ভেতরে। ১৮৯৮ সালে গড়ে তোলেন ‘রয়্যাল বায়োস্কোপ কোম্পানি’। উপমহাদেশে প্রথম সিনেমা বানিয়েছেন কে, এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু হীরালাল সেন যে এই অঞ্চলের প্রথম চলচ্চিত্র প্রদর্শক– এ বিষয়ে কারও কোনো সন্দেহ নেই।
চলচ্চিত্র আর হীরালাল যেন সমার্থক শব্দ। ১৯০০ সালে ফ্রান্সের প্যাথে কোম্পানি ছবি তোলার জন্য ভারতে আসে। হীরালাল তাদের সঙ্গে জুড়ে যান, ক্যামেরা কেনেন এবং কলকাতার বিভিন্ন দৃশ্য চলচ্চিত্রায়ন করেন। এরপর যোগাযোগ করেন অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সাথে। অমর দত্ত তখন কলকাতার ক্লাসিক থিয়েটারের মালিক। ওখানে মঞ্চস্থ হওয়া বিভিন্ন নাটকের নির্বাচিত খণ্ডদৃশ্য হীরা তার ক্যামেরায় বন্দি করেন। তার নির্মিত ছবিগুলোর মধ্যে ছিল ‘সীতারাম’, ‘আলীবাবা’, ‘ভ্রমর’, ‘বুদ্ধ’ প্রভৃতি। এভাবেই হীরালাল প্রথম বাঙালি সিনেমা প্রদর্শক থেকে বনে যান সিনেমা নির্মাতা। তিনি উপমহাদেশের প্রথম তথ্যচিত্র ও বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতাও।
১৯০৫ সালে হীরালাল সেন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের দৃশ্য তোলেন, যা ভারতের প্রথম রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে ইতিহাসে বিবেচিত হয়। টাউন হলের ওই ঐতিহাসিক সভায় শরিক হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এই ছবিকে মহান দেশপ্রেম ও খাঁটি স্বদেশি সিনেমা বলে আখ্যা দিয়েছিলেন হীরালাল। রাজনৈতিক তথ্যচিত্র দেখানোর জন্য তাকে বেশ সমস্যায়ও পড়তে হয়। সমস্যা আরও ডালপালা মেলে, যখন হীরালালের শরীরে বাসা বাঁধে ক্যান্সার। শেষ দিকে অতিশয় শোক ও অর্থকষ্টে কাটে বাংলা সিনেমার পথিকৃতের জীবন। অভাবের তাড়নায় বাড়ি বিক্রি করে দেন, বিক্রি করেন সাধের ক্যামেরাও। ‘যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের, মানুষের সাথে দেখা হয় নাকো তার..’
১৯১৭ সালে এক দুর্ঘটনায় তার নির্মিত সব ফিল্ম আগুনে পুড়ে যায়। এর কয়েক দিন পরই পুড়ে যায় যেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রকাণ্ড বটবৃক্ষ। সে বছরের ২৯ অক্টোবর (মতান্তরে ২৪, ২৬, ২৭, ২৮ অক্টোবর) সবার অজান্তে নিভৃতে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন ট্র্যাজিক হিরো হীরালাল। হীরালাল নির্মিত চলচ্চিত্রের পূর্ণ সংখ্যা হয়তো কখনও জানা যাবে না। সেসব সিনেমার মেমেন্টো বা নিদর্শনও হয়তো আর পাওয়া যাবে না। তবে চলচ্চিত্র গবেষকদের কারও কারও ধারণা– ইউরোপ বা আমেরিকার আর্কাইভগুলো খুঁজলে তার সিনেমার ছিটেফোঁটা মিললেও মিলতে পারে। কে জানে, হয়তো ভবিষ্যতের কোনো গবেষক হীরালালের সিনেমা সম্পর্কে নতুন কোনো মণিমুক্তোর সন্ধান দেবে।