সংসদের খুঁটিনাটির মধ্যে গতকাল(৫জুন) আমার বারবারই চোখ যাচ্ছিল আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা, তুখোড় রাজনীতিবিদ ও ইতিহাসের অংশ তোফায়েল আহমেদের দিকে। ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের এই মহানায়ককে সবসময়ই দেখেছি নিজস্ব ঢংয়ে স্মার্টলি হেটে এসে নিজের আসনে বসতেন। আসার পথে ডানে-বামে অনেকের সালামের জবাব দিতেন, কারও কারও সাথে হাত মেলাতেন। কিন্তু গতকাল এ কোন তোফায়েল আহমেদকে দেখলাম সংসদে!
সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবীর ওপর মুজিবকোট পরিহিত তোফায়েল আহমেদকে দুইজন দুই পাশ থেকে ধরে ধিরলয়ে হাটিয়ে আসনে এনে বসালেন। শোক প্রস্তাবের অংশ হিসেবে প্রয়াতদের সম্সানে সবাই যখন দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করছিলেন, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন বসা। প্রয়াতদের আত্মার শান্তি কামনায় প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারসহ সবাই যখন দাঁড়িয়ে মোনাজাত করছিলেন, তখনও বসেই মোনাজাতে শরিক হন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠক। উঠে দাঁড়ানোর কিংবা নিজে-নিজে চলাফেরার শক্তি হারিয়েছেন রাজনীতির মাঠের তুখোড় এই খেলোড়ার।
মাগরিবের আগে যখন তোফায়েল আহমেদ বের হচ্ছিলেন তখনও তাকে অন্যরা ধরাধরি করে লবিতে নিয়ে যান। এরপর হুইল চেয়ারে করে লিফটে নেমে গাড়িতে ওঠেন। হুইল চেয়ার পেছন থেকে ঠেলছিলেন এমপি ডা. হাবিবে মিল্লাত। সঙ্গে ছিলেন ভোলার এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনসহ কয়েকজন। তারা তাকে নিয়ে গাড়িতে তুলে দিলেন। তোফায়েল আহমেদের গাড়ির সামনের আসনে বসেছিলেন হাবিবে মিল্লাত। তোফায়েল আহমেদ ক্ষীণ স্বরে বলছিলেন, ‘না, না, যেতে হবে না’। হাবিবে মিল্লাত জবাবে বললেন, ‘স্যার আমি আপনাকে বাসায় দিয়ে আসবো’। একথা বলেই হাবিবে মিল্লাত গাড়িতে উঠে বসলেন। এমপি শাওনও যেতে চেয়েছিলেন। যাবার সময় তোফায়েল আহমেদ তাদেরকে বললেন, ‘আমার জন্য দোয়া করো’। তারাও তার কাছে দোয়া চাইলেন।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম থেকে যেদিন বাদ পড়েন সেদিন প্রতিক্রিয়া জানতে তোফায়েল আহমেদকে ফোন করেছিলাম। তিনি সেদিন আমাকে বলেছিলেন, ‘পদ-পদবি বিষয় না, আমি আওয়ামী লীগের তোফায়েল, আমি বঙ্গবন্ধুর তোফায়েল- এটাই আমার বড় পরিচয়। তরুণ বয়সে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেব দায়িত্ব পালন করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছি। আমার জীবনে আর কী চাওয়া-পাওয়া থাকতে পারে!’ কথাগুলো যখন বলছিলেন সেদিনের তার কণ্ঠে কষ্টের ছাপ আজও আমার মনে আছে।
গতকাল যখন সাদা প্রাডো গাড়িতে চড়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন, আমি এক হাত দূরে থেকে হাত তুলে সালাম জানালাম। তিনিও স্বভাবসুলভ ডান হাত তুলে জবাব দিলেন। গাড়ির কালো গ্লাস উপরে উঠে গেল। অদৃশ্য হয়ে গেলেন বাংলাদেশের তোফায়েল আহমেদ। গাড়িটি সংসদ ভবন ত্যাগ করলো। আমি লেকের পাড়ে কিছুক্ষণ নিরবে দাঁড়িয়ে কতকিছু ভাবলাম।