• ২৯শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরানে যেভাবে কবর রচিত হয়েছিল মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের

দখিনের সময়
প্রকাশিত জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ০৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
ইরানে যেভাবে কবর রচিত হয়েছিল মার্কিন ডেল্টা ফোর্সের
সংবাদটি শেয়ার করুন...
দখিনের সময় ডেস্ক:
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে গত ৩ জানুয়ারি ব্যাপক হামলা চালিয়ে চালিয়ে মার্কিন বাহিনীর ‘ডেল্টা ফোর্স’ ভেনেজুয়েলার সুরক্ষিত প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে তুলে নিয়ে গেছে। অবিশ্বাস্য এই অভিযান সফল করে বিশ্বব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে মার্কিন সেনাবাহিনীর এই ডেল্টা ফোর্স। কিন্তু ‍এই ফোর্সই ‍ইরানে ব্যর্থ হয়েছিলো। ইরানি ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব এই ডেল্টা ফোর্সেরও কবর রচিত হয়েছিল।
ব্যর্থ এ অভিযানে মার্কিন ডেল্টা ফোর্স ফেলে যায় তাদের হেলিকপ্টার, সরঞ্জাম, অস্ত্র, মানচিত্র এবং তাদের নিহত সহকর্মীদের মৃতদেহ। এরপর ব্যর্থ এই অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই ঘটনা ১৯৮০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিমি কার্টারের পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ঘটনার পর ইমাম খোমেনি বালুঝড় ও বালুকণাকে সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে আগ্রাসনের শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ইরানের ভূখণ্ড লঙ্ঘন করে এই আগ্রাসী অভিযান চালানোর মাধ্যমে জিমি কার্টার মূলত ওই বছরের নির্বাচনে নিজের জয় নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। সামরিক দিক থেকে ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল এক কঠিন শিক্ষা। এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ অভিযান কাঠামোয় বড় সংস্কার আনে। পরবর্তীতে গঠন করা হয় ইউইস স্পেশাল অপারেশনস কমান্ড।
জানা যায়, ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব হয়। এরপর তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল করে নেন ইরানি বিপ্লবীরা। সে সময় ৫২ জন মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মীকে জিম্মি করেন তারা। এ ঘটনায় বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ কয়েক মাস কূটনৈতিক চেষ্টা চালিয়েও বন্দিদের মুক্ত করতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ওপর রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শেষ পর্যন্ত সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। গোপন সেই উদ্ধার অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’। ১৯৮০ সালে অভিযানটি পরিচালনা করে মার্কিন বাহিনীর সেই দুর্র্ধষ ই্উনিট ‘ডেল্টা ফোর্স’। তবে সেই অভিযান ডেল্টা ফোর্সের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল তেহরানে আটক মার্কিন দূতাবাসের ৫২ কর্মীকে উদ্ধার করা। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর বিপ্লবী ছাত্ররা তেহরানের মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়, যাকে ইরানে ‘গুপ্তচরবৃত্তির ঘাঁটি’ বলা হয়। ওই ঘটনার পর থেকেই দূতাবাসের কর্মীরা আটক ছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত ইরানি শাসক মোহাম্মদ রেজা শাহ পেহলভিকে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার দুই সপ্তাহ পরে এই ঘটনা ঘটে। ইরানের নতুন নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি শাহকে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানে পশ্চিমা প্রভাবের অবসানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতেই অভিযানের কয়েক সপ্তাহ আগে, দূতাবাস দখলের ঘটনার জেরে ওয়াশিংটন ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। এরই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক কমান্ডাররা সম্ভাব্য উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন এবং সংশ্লিষ্ট সেনা ও সরঞ্জামের সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রশিক্ষণ মহড়া চালান। ১৯৮০ সালের ১৬ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট কার্টার এই সামরিক অভিযানের অনুমোদন দেন। পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্স, নেভি ও মেরিন কর্পসের বিভিন্ন বিশেষ ইউনিটের সমন্বয় ছিল। দুই দিনব্যাপী এই অভিযানে হেলিকপ্টার ও সি-১৩০ পরিবহন বিমানের মাধ্যমে ইরানের ভেতরে প্রবেশের পরিকল্পনা করা হয়। পুরো অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল চার্লি বেকউইথ।
পরিকল্পনা ছিল হেলিকপ্টার ও সি-১৩০ বিমানগুলো তেহরান থেকে প্রায় ২০০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে একটি লবণাক্ত সমতলে মিলিত হবে। সেখানে হেলিকপ্টারগুলো সি-১৩০ থেকে জ্বালানি নেবে এবং কমান্ডোদের বহন করবে। পরদিন রাতে পাহাড়ি এলাকা থেকে মূল উদ্ধার অভিযান পরিচালিত হবে। এর অংশ হিসেবে ১৯ এপ্রিল থেকেই ওমান ও আরব সাগরজুড়ে মোতায়েন করা হয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সামরিক বাহিনীর সদস্যদের।
১৯৮০ সালের ২৪ এপ্রিল রাতে শুরু হয় অভিযান। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস নিমিটজ এবং মিসরের একটি বিচ্ছিন্ন বিমানঘাঁটি থেকে ৮টি আরএইচ-৫৩ডি সি স্ট্যালিয়ন হেলিকপ্টার ও সি-১৩০সহ কয়েকটি পরিবহন বিমানে বেকউইথ এবং তার ১২৩ জন সদস্যের বাহিনী আরব সাগর পেরিয়ে প্রায় ৬০০ মাইল পথ অতিক্রম করে ইরানের মরুভূমিতে প্রবেশ করে। প্রথম ধাপে বাহিনী পৌঁছায় ইরানের মরুভূমির একটি গোপন অবতরণস্থলে, যার সাংকেতিক নাম ছিল ‘ডেসার্ট ওয়ান’। কিন্তু শুরু থেকেই সমস্যার মুখে পড়ে মার্কিন বাহিনী। পথে মরু ঝড় বা ‘হাবুব’-এর কারণে একাধিক হেলিকপ্টার যান্ত্রিক ত্রুটিতে পড়ে। অভিযানের জন্য নির্ধারিত আটটি হেলিকপ্টারের মধ্যে দুটিতে সমস্যা দেখা দেয়। বাকি ছয়টি হেলিকপ্টার ৯০ মিনিটেরও বেশি দেরিতে ডেজার্ট ওয়ানে পৌঁছায় এবং সেখানে পৌঁছানোর পর আরও একটি হেলিকপ্টার অকেজো হয়ে পড়ে। এর ফলে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম ছয়টি হেলিকপ্টার আর অবশিষ্ট থাকে না। এতে পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বালুঝড়ের কারণে দৃশ্যসীমা মারাত্মকভাবে কমে যায়। সেখানে থাকা একজন সেনা কর্মকর্তা পরবর্তীতে বলেছিলেন, “হেলিকপ্টারগুলোকে প্রথমে অপ্রত্যাশিত ধুলোর মেঘের মধ্য দিয়ে বিপজ্জনকভাবে চলতে হচ্ছিল। আমরা প্রায় ৩০০ ফুট উপরে ছিলাম, আমরা মাটি দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমরা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম।” হেলিকপ্টার সংকট ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতির অবনতির খবর পেয়ে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ও তার উপদেষ্টারা অভিযান বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযান প্রত্যাহারের পর ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতির সময় একটি আরএইচ-৫৩ডি হেলিকপ্টার মরুভূমিতে অবতরণ হয়ে থাকা অতিরিক্ত জ্বালানি বহনকারী একটি সি-১৩০ বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে। এতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং পরবর্তীতে আকাশযান দুটি ভয়াবহভাবে আগুনে পুড়ে যায়। এ ঘটনায় পাঁচজন বিমানবাহিনীর সদস্য ও তিনজন মেরিনসহ নিহত হন ডেল্টা ফোর্সের মোট আটজন মার্কিন সেনা। দীর্ঘ ৪৪৪ দিন পর ইরানের সেই হোস্টেজ সংকটের অবসান ঘটে। অবশেষে ১৯৮১ সালের ২০ জানুয়ারি, রোনাল্ড রিগ্যানের শপথ গ্রহণের দিন বন্দিরা মুক্তি পান। কোনও প্রতিরোধ ছাড়া ডেল্টা ফোর্সের করুণ পরিণতি ও ব্যর্থতার ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ আজও সামরিক ইতিহাসে এক ব্যর্থ কিন্তু শিক্ষণীয় অধ্যায়। সূত্র:  তেহরান টাইমস