• ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জামায়াত জোটের গোজামিলের অসন বন্টন, বিভেদের নেপথ্য কারণ

দখিনের সময়
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৬, ২০২৬, ০৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
জামায়াত জোটের গোজামিলের অসন বন্টন, বিভেদের নেপথ্য কারণ
সংবাদটি শেয়ার করুন...

ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান গণমাধ্যমকে

বলেছেন, জামায়াত একেবারে বিএনপি-আওয়ামী লীগের

মতো আচরণ করছে। জামায়াতই অন্য দলগুলোকে

আসনে ছাড় দিচ্ছে, এমন একটা মনোভাব তাদের।

আলম রায়হান:
বৃহস্পতিবার রাতে ‍এক সংবাদ সম্মেলনে দলভিত্তিক আসনসংখ্যা ঘোষণা করেছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এদিকে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, জাগপা ও খেলাফত আন্দোলনের আসনের বিষয়টি এখনও নির্ধারণ করা যায়নি। প্রাথমিক আসন সমঝোতায় জামায়াত ১৭৯টি, এনসিপি ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, এলডিপি ৭টি, এবি পার্টি ৩টি, বিডিপি ২টি ও নেজামে ইসলাম ২টি আসন পেয়েছে। কিন্তু ‍এরপর কী? গোজামিলের ‍এই আসন বন্টন কি শেষ পর্যন্ত জামায়াতের ১১ দলীয় জোট অটুট রাখতে প‍ারবে? এ প্রশ্ন সামনে চলে ‍এসেছে। আছে আরো অনেক প্রশ্ন।
প্রসঙ্গত ১১ দলীয় জোটে দলের কাঠামো ও কর্মী-অনুসারী বিবেচনায় জামায়াতের পরই ইসলামী আন্দোলনের অবস্থান। শুরুতে ইসলামী দলগুলোর একটি ভোট বাক্সের স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু ধর্মভিত্তিক সব দল তাতে সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, মোর্চাটিকে যেহেতু নির্বাচনী আসন সমঝোতার জোটে রূপ দেওয়া হচ্ছে, ফলে সেখানে বিভেদ বা সংকটের পেছনে আসন বন্টনের বিষয়টিই বড় কারণ। তারা এ-ও উল্লেখ করছেন, ধর্ম ভিত্তিক দলগুলোর স্ব স্ব রাজনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় থেকেও তাদের নির্বাচনী জোটে সংকট বেড়েছে। ঐক্যের কথা বললেও জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যেটা জোটের অন্যদের ক্ষুব্ধ করছে বলে বলছেন ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতারা। আসন ভাগাভাগিতে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে জোটের অন্য দলগুলোর অসন্তোষ রয়েছে। যা আপতত প্রশমন করাগেছে বলে ১১ জানুয়ারী কেউকেউ মনে করছেন।
তবে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানাগেছে, জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তাদের আগের ‘অবিশ্বাস’, ‘সন্দেহ’ ‍এখনো রয়েগেছে। এর পেছনে ওই দলগুলো কিছু ঘটনাকেও উদাহরণ হিসেবে টেনে আনছেন। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের এককভাবে বৈঠককে মেনে নিতে পারেনি ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল। যদিও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গিয়ে জামায়াত নেতা সেই বৈঠকটি করেছিলেন। কিন্তু বৈঠকে জামায়াতের আমির নির্বাচনের পরে সরকার গঠনের আগে বিএনপি নেতার সঙ্গে আলোচনা করতে চেয়েছেন এবং রাজনীতি নিয়ে কথা বলেছেন। যা জামায়াতের সঙ্গে থাকা ইসলামী অন্য দলগুলোকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে অভিমত পর্যবেক্ষক মহলের।
এছাড়া সরাসরি ধর্মভিত্তিক দল নয়, যেমন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং এবি পার্টিকে আসন সমঝোতায় শরিক করা হয়েছে। এই তিনটি দলকে যুক্ত করা এবং আসন সমঝোতা করার ক্ষেত্রে জামায়াত তাদের মোর্চা বা জোটের অন্য দলগুলোর সঙ্গে সে ব্যাপারে কোনো আলোচনা করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, জামায়াত একেবারে বিএনপি-আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে। জামায়াতই অন্য দলগুলোকে আসনে ছাড় দিচ্ছে, এমন একটা মনোভাব তাদের। আসন সমঝোতার কথা বলা হচ্ছে যেসব আসনে, সেগুলোতেই জামায়াত তাদের প্রার্থী রেখে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে। তারা আসলে অন্য দলগুলোকে অবহেলা করছে, অপমান করছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের নেতাদেরও একই রকম অভিযোগ রয়েছে। তাদেরও অবিশ্বাস, সন্দেহ তৈরি হয়েছে জামায়াতকে নিয়ে।
অবশ্য জামায়াতের নেতারা এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়াসহ শরিকদের বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করছেন।
জোটের কোনো কোনো দল মনে করছে, একদিকে আসন সমঝোতায় অস্পষ্টতা রয়েছে, অন্যদিকে ঐক্যের রাজনৈতিক কোনো নীতিমালা ঠিক করা হয়নি। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিবিসি বাংলাকে বলেন, ১১ দলের আসন সমঝোতার বিষয়ে এখনো বেশ কিছু অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমঝোতার সুনির্দিষ্ট একটি ‘রাজনৈতিক স্মারক’ নির্ধারণ করা দরকার ছিল, যা এখনো হয়নি। তিনি এ-ও উল্লেখ করেন, দলগুলোর একত্রে এখন পর্যন্ত কোনো বৈঠকও হয়নি। আসন সমঝোতার ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থান, সমর্থন ও নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতার পাশাপাশি সংসদে দক্ষতা ও যোগ্যতা সম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা ছিল। সেক্ষেত্রেও দলগুলোর অসন্তোষ রয়ে গেছে।
জামায়াতকে নিয়ে ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের সন্দেহ, আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে সংকটটা গভীর বলেই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। তারা বলছেন, ধর্মীয় নেতা বা পীর কেন্দ্রিক দল এবং কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে অতীতে জামায়াতের তেমন ভালো সম্পর্ক ছিল না। এই দলগুলোর সম্পর্কের পরিবর্তন দেখা যায় জুলাই গণ-অভ্যত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর। জামায়াত ও অন্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোও তৎপর হয়েছিল তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন দূর করতে। সেই তৎপরতার প্রেক্ষাপটেই আসন সমঝোতার ১১ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। শেষপর্যন্ত ১১ দলের ঐক্য টিকবে কিনা- সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট টিকিয়ে রাখার জোর চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ঘোষণা অনুযায়ী, ১১ দলীয় ঐক্যে থাকা দলগুলোর মধ্যে মোট ২৫৩ আসনে সমঝোতার কথা ১৫ জানুয়ারি রাতে জানানো হয়েছে। বাকি আসনগুলোর বিষয়ে ‘পরবর্তীতে’ জানানো হবে বলেও উল্লেখ করেছেন আবু তাহের। সংবাদ সম্মেলনে, ইসলামী আন্দোলন কেন অনুপস্থিত- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের আমির বলেন, ‘তারা নিজেদের মধ্যে আরও আলোচনা করছেন, আমরা আশা করছি তারা আমাদের সঙ্গে থাকবেন। জোট ভাঙে নাই, জোট আছে।’ তবে ‍ইসলামী আন্দোলন ফিরে না আসলে জোট বড় ধরনের হোচট খাবে- ‍এ ব্যাপারে কোন সংশয় নেই।