Home ফিচার স্কুল জীবনের দিন গুলো !

স্কুল জীবনের দিন গুলো !

গোলাপি এবং সাদা রঙের ইউনিফর্ম আমার কাছে এই পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর পোশাক।কারণ এটি আমার প্রিয় বিদ্যালয়ের ইউনিফর্ম। সাল ২০১৪, বাবার হাত ধরে ভর্তি পরীক্ষা দেবার জন্য যাই এবং আল্লাহর রহমতে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হই বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন ও শীর্ষস্থানীয় বালিকা বিদ্যালয় বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ।

বরিশাল শহরের কবি জীবনানন্দ দাশ রোডে (পূর্ব বগুড়া রোড) ১৯২৩ সালে বরিশাল শহরে নারীদের শিক্ষা প্রসারের উদ্দেশ্যে এ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়। বর্তমানে প্রভাতী ও দিবা – দুটি শাখায় তৃতীয় শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ছাত্রীদের পাঠদান করা হয়।

বিভিন্ন বছর বরিশাল বোর্ডের দ্বিতীয় সেরা বিদ্যালয় হিসেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা মাহাবুব হোসেন ম্যাম সহ ৪৯ জন শিক্ষকমন্ডলী আছেন। অসংখ্য গুনী নারীর আতুরঘর এই বিদ্যালয়। প্রতিটা মানুষের জীবনেই আছে একটি শ্রেষ্ঠ ইতিহাস,একটি সুন্দর অধ্যায়। আমার মতে মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হচ্ছে স্কুল জীবন।

একদিন একদিন করে একটা বছর,এক বছর এক বছর করে গোটা ৭টা বছর কেটে গেল।কিন্তু মনেই হয় না ৭ টা বছর কেটে গেছে এক নিমেষে। আর একবছর তারপর মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে প্রিয় বিদ্যালয় ছেড়ে যেতে হবে।মনে পড়ে সেই প্রথমদিনে নতুন স্কুল,নতুন সব মানুষ, নতুন মাঠ,নতুন ক্লাস রুম,নতুন শিক্ষকরা, নতুন সবকিছু। সম্পূর্ণ নতুন এবং অন্য জগতে পা দিলাম। অনেক ভালো লাগত তখনকার সেই দিনগুলো। প্রথম ক্লাসের পর শিক্ষকরা বলে যেতেন ক্লাস থেকে বের না হতে,আমরাও বের হতাম না। সবকিছুই অচেনা তেমন সাহসও আমাদের কারও ছিল না। তারপর টিফিন পিরিয়ডে পুরো স্কুলটা ঘুরে ঘুরে দেখা। প্রথম প্রথম মনে হতো কখনোই হয়ত এই স্কুল টাকে পুরো চিনে উঠতে পারব না, এত্ত বড় স্কুল, কত্ত কত্ত ক্লাস রুম। আসলে এই কথা গুলো এখন ভাবলে হাসি পায় আবার অনেক ভালোও লাগে। কত কিছু তখন স্কুল টাকে নিয়ে,কত্ত কিছু। কিন্তু আস্তে আস্তে করে সবকিছুই খুব আপন হয়ে যায়।তারপর টিফিন পিরিয়ড শেষে আবার ক্লাস রুমে এসে পরতাম। তখন আমাদের স্কুল ছুটতে হত ১১ঃ৩০-এ কিন্তু একটুও বাসায় যেতে ইচ্ছা করত না।তারপর আবার রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পরতাম ভাবতাম সকাল হলেই তো আবার স্কুলে যাব।

আহা!কত কিছু ভাবতাম তখন। রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রাখতাম। ইচ্ছে করে আবার সেই ছোট্ট হয়ে আবার নতুন করে পদার্পণ করি এই স্কুলে।কিন্তু সেটা আর কোন ভাবেই সম্ভব না,কখনোই না। এভাবে কত কত স্মৃতি,কত কত কান্না-আনন্দ,ভালোবাসা লুকিয়ে আছে স্কুলের প্রতিটা কোনেতে । আস্তে আস্তে করে সবাই-সবকিছু অনেক আপন হয়ে পরে আমার। শিক্ষকরা পাঠদানের পাশাপাশি কত্ত মজা করত আমাদের সাথে।আবার মাঝে মাঝে যখন বকা দিত তখন অনেক খারাপ লাগত। কিন্তু এখন ভাবলে মনে হয় ওই বকা দেওয়ার মাঝেও লুকিয়ে ছিল এক পবিত্র ভালোবাসা, মায়া। আস্তে আস্তে করে সবকিছুই হারিয়ে যাবে,যাচ্ছে। হারিয়ে যাবে ঠিকই কিন্তু স্মৃতির পাতায় খোদাই করা থাকবে এই সুন্দর অধ্যায়টি। বার বার ইচ্ছে করে স্মৃতির প্রতিটি পাতা,প্রতিটি অধ্যায় আবার নতুন করে পড়ি।পড়লেও পুরনো হয় না অধ্যায়টি। জাগিয়ে তোলে সেই স্মৃতিগুলো নিজের মাঝে,ফেলে আসা সেই দিনগুলো।

আসলে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো যখন ক্লাস ৫ এ পরতাম তখন সবাই বলত স্কুলের পিছনে যে বাথরুম আছে সেখানে নাকি ভুত আছে।খুবই আগ্রহ নিয়ে চুপচাপ যেতাম যাতে কেউ না দেখে,কত্ত সাহস তাই না! আসলে এইগুলো তখন বিশ্বাসও করতাম। খুব ভালো লাগে ব্যাপারগুলো এখন।তারপর যখন ক্লাস ৬-এ উঠি সেই সময় টায় আরএ বেশি ভালো লাগতে শুরু করে স্কুলটাকে। কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল না।স্কুলের সব আনাচে কানাচে অনেকটাই পরিচিত হয়ে যায়। তখন ভাবতাম এতো অনেক সোজাই সবকিছু তো চেনা আমাদের।ক্লাস ফাঁকি দেয়ার ইচ্ছে হয় হয় তখন। প্রায়ই ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ৩য় তালায় গিয়ে বন্ধুরা একসাথে গল্প করতাম,গান গাইতাম। খুব মজা হতো। অনেক ফিরে যেতে ইচ্ছে করে দিনগুলো।

মাঝে মাঝে স্কুলও পালিয়েছি। স্কুল পালানো মানে অনেকেই ভাবে খুব খারাপ কিন্তু আমার সেটা কখনোই মনে হয় না। আসলে স্কুল জীবনটা খুবই অল্প সময়ের সেই সময়টাকে যতটা পারা যায় উপভোগ করা উচিৎ। আমিও তাই করেছি।মাঝে মাঝে ক্লাসে শিক্ষকরা অনেক বকাবকি করত স্কুল পালানো নিয়ে।সেগুলোও ভালো লাগত তখন। অনেক হাসাহাসি করতাম তখন বন্ধুরা মিলে। আহা!কি সুন্দর, কি উজ্জ্বল ছিল সেই দিনগুলি।

আর মাত্র ১ বছরের মাঝে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।যখন ক্লাস ৬/৭ এ পরতাম তখন দেখতাম ক্লাস ১০ এর অনেক কম আপুরাই স্কুলে আসত। খুব বেশি হলে ১০/১২ জন। তখন আমরা এগুলো দেখে হাসতাম, বলতাম কত কি! কিন্তু আজ আমি নিজেই সেই পরিস্থিতির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অনেক কষ্ট হয় ভাবতে যে আর স্কুলের বেঞ্চে বসে ক্লাস করা হবে না, ক্লাসে কথা বলার জন্য ক্লাস থেকে বের করে দেওয়ার পর পাশের ক্লাসের বন্ধুদের সাথে হাসাহাসি করা হবে না,ক্লাস বাদ দিয়ে আয়না দেখতে যাওয়া আর হবে না।

আমি যে এই লেখছি তাও যেন শেষ হতে চায় না।যত লেখি ততই লিখতে ইচ্ছা করে। অবিরাম চলতে থাকে হাতের কলমটা থামতে চাচ্ছেনা। স্মৃতির আয়নাটা বার বার ঝাপসা হয়ে যেতে চায়,চায় ধুলো পড়ে ঘোলাটে হয়ে যেতে।কিন্তু না সেই ধুলো উপেক্ষা করে নতুন করে বাঁচিয়ে রাখি অধ্যায়টি। হয়ত আর ১টা বছরের মাঝে স্কুলের গন্ডিটা পেরিয়ে আসব ঠিকই কিন্তু ভুলতে পারব না এই সুন্দর অধ্যায়টিকে। বেঁচে থাকবে সবসময় নিজের মাঝে। স্মৃতির পাতায় ধুলো জমে জমে ময়লা পরে যাবে ঠিকই কিন্তু প্রথম পাতাগুলো জুড়ে থাকবে এই অধ্যায়টি।

লেখকঃ ফারিহা আহমেদ মিথি

১০ শ্রেণি, বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়,

বরিশাল।

1 COMMENT

  1. বাহ,, খুব সুন্দর লিখেছ। অভিনন্দন এবং শ্রদ্ধা এত সুন্দরভাবে স্মৃতিগুলো উপস্থাপন করার জন্য।
    লেখাগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়,, স্মৃতিগলো প্রায় সবটাই আমাদের সবার স্কুল জীবনের সাথে মিলে যায়। লেখাটি পড়ে সত্যিই আবেগী হয়ে পড়েছি, স্কুল জীবনের স্মৃতিগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠল। পুরোনো সেই দিনগুলো কতই না সুন্দর ছিল। ক্লাসে হইচই , স্যারদের বকাবকি , আদর , ভালোবাসা। কতই না রোমাঞ্চকর ছিল স্কুল ফাঁকি দেওয়ার সেই দিনগুলো। ভুলবোনা কিছুই। ভাবতেই অবাক লাগে সেই দিনগুলো আর আসবেনা ফিরে। ?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

উন্নত প্রযুক্তি সমৃদ্ধ আঙুলের রিং আনছে স্যামসাং, থাকছে যেসব ফিচার

দখিনের সময় ডেস্ক: বছরের প্রথম ‘গ্যালাক্সি আনপ্যাকড’ ইভেন্টে নতুন গ্যালাক্সি এআই প্রযুক্তি এবং গ্যালাক্সি এস২৪ স্মার্টফোন সিরিজের ঘোষণা করেছে স্যামসাং। গতকাল (১৭ জানুয়ারি) আয়োজিত ইভেন্টটির...

অন্যের চার্জার দিয়ে ফোন চার্জ দিয়ে নিজের যে ক্ষতি করছেন

দখিনের সময় ডেস্ক: মোবাইল ফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। সবার হাতে হাতেই এখন মোবাইল ফোন। তবে ফোন আলাদা হলেও চার্জারের ক্ষেত্রে অনেকেই চিন্তা করেন...

আইফোনে পাসকোড ব্যবহারে সতর্কতার পরামর্শ

দখিনের সময় ডেস্ক: স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। বর্তমানে আইফোনের জনপ্রিয়তাও বেশ। প্রয়োজনীয় প্রিয় ফোনটি চুরি হলে বা হারিয়ে গেলে হতাশ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।...

আদা বেশি খাওয়ার অপকারিতা

দখিনের সময় ডেস্ক: আদার অনেক উপকারিতার কথা জেনেছেন নিশ্চয়ই। সর্দি-কাশি সারানো থেকে বমি বমিভাব দূর, নানা উপকারে লাগে এই ভেষজ। আবার আমাদের প্রতিদিনের রান্নায়ও ব্যবহার...

Recent Comments