• ২৯শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৪ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হায় জীবন! হায় সন্তান!!

দখিনের সময়
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২৪, ২০২০, ০৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
হায় জীবন! হায় সন্তান!!

জুবায়ের আল মামুন ॥
স্বল্প মেয়াদী জীবনে মানুষের কতোই না প্রত্যাশা, কতই না স্বপ্ন। কতই না ভরসা করেন স্বজনদের উপর,  ভরসা করেন সন্তানদের উপর। কিন্তু শেষ প্রাপ্তি কোনখানে গিয়ে দাঁড়ায়? এর একটি উদাহরণ হতে পারেন মোহাম্মদ কালাম সর্দার। প্রখম জীবনে তার কি স্বপ্ন ছিলো তা জানা যায়নি। তবে শেষ জীবনে তিনি কোনই স্বপ্ন দেখতেন না- এটি নিশ্চিভাবে বলা যায়। তিনি কেবল কোন রকম ক্ষুধা নিবারণ করতে চেয়েছিলেন নিজের পরিশ্রম দিয়ে।  কিন্তু  তা আর হলো না। জীবনের শেষ সময়টা তার কেটেছে প্রচন্ড ক্ষধার যন্ত্রণায।

মোহাম্মদ কালাম সর্দারের  জীবনের শেষ মুহুর্ত কেটেছে অবজ্ঞা আর অবহেলায়। জীবিকার অবলম্বন ছিলো ঢ্যাং জাল। এর পাশেই টং ঘরে থাকতেন। মৃত্যুর দুইতিনদিন আগে তিনি ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিজের ভিটায় নিজ সন্তানের কাছে গিয়ে ভাত খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রত্যাখাত হয়েছেন। এদিকে অসুস্থতার কারণে উপার্জন করার শক্তিও ছিলো না। ফলে পরোপারে গেছেন অভুক্ত থাকার যন্ত্রনা নিয়েই। সঙ্গে রোগ যন্ত্রণাতো ছিলোই।
একেতো বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। অসুস্থ শরীর, তার উপর ক্ষুধায় কাতর। সঙ্গে যুক্ত হলো সন্তানের প্রকাশ্য অপমান। হয়তো আর সহ্য হয়নি মোহাম্মদ কালামের। তবে তিনি কোন প্রতিবাদ করেনি। করেননি টুশব্দটি পর্যন্ত। তার কাছে সন্তানের ঋণের কথা মনে করিয়ে দেননি। এমনকি তার ভিটার অবস্থান করার কথাও মনে করিয়ে দেননি। বরং নীরবে ফিরে গেছেন তার মাছ ধরার স্থানে। কিন্তু তার আর মাছ ধরা হয়নি। মঙ্গলবার(২২ ডিসেম্বর) বিকেলে পাওয়াগেলো তার মৃতদেহ।
বরিশাল সদর উপজেলার ১নং রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা দরিদ্র মোহাম্মদ কালাম সর্দার। তার বয়স হয়েছিলো প্রায় ৭০ বছর। স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। আপন বলতে তার ছিলো দুই ছেলে দুই মেয়ে। বড় ছেলে থাকে বাবার ভিটায়। আর বসুর হাট সংলগ্ন বৌসের খালে ঢ্যাং জাল দিয়ে মাছ ধরে জীবন চালাতো কালাম সর্দার। কিন্তু খালে মাছ বলতে ধরাপড়ে সামান্যই। তা বিক্রি করে তিনবেলা ভাত খাবার উপায় ছিলো না। অনেক সময় না খেয়েই বেলা পার করতে হতো তাঁকে। তবু তিনি সন্তানদের ‘বিরক্ত’ করতেন না। কিন্তু সেদিন আর ক্ষুধা সহ্য হচ্ছিলো না। নিজের ভিটায় গিয়ে বড় সন্তানের কাছে ভাত খেতে চাইলেন। বললেন, ‘কোমরে বাত ধরছে, জাল বাইতে পারি না। বউরে দুইডা ভাত দিতে ক, বাবা।’ উত্তরে আদরের সন্তান বললো, “মাছ ধরতে না পারলে নাখাইয়া থাকো!”
একে বার্ধক্য জনিত অসুস্থতা, পেটে ক্ষুধার আগুণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সন্তানের অবহেলা-অপমান। শেষতক তিনি আর সহ্য করতে পারেননি। মনের কষ্টে ফিরে গেছেন জীবিকার অবলম্বন ঢ্যাং জালের কাছে। কিন্তু জালে আর মাছ ধরা পড়েনি। বরং তার প্রাণ পাখি খাঁচাছাড়া হয়েছে। এরপরও স্বজনরা তার খবর রাখেনি। দুইতিন দিন দেখতে না পেয়ে তাবলিগ জামাতের এক সতীর্থ তাকে খুঁজতে যান। অনেক ডাকাডাকি করার পরও সাড়া না পেয়ে টং-এর ভিতর উকি দিয়ে দেখা গেলো, নিথর হয়ে পড়ে আছেন মোহাম্মদ কালাম সর্দার। এর পর সাড়া পড়েগেলো এলাকায়। পুলিশও এলো। কেউ কেউ আবার বিষয়টিকে ঘোলাটে করে অন্যখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করলো। কিন্তু অভিজ্ঞ পুলিশ কর্মকর্তা সে দিকে যাননি। বরং দাফনের অনুমতি দিয়েছেন।
এরপর মোহাম্মদ কালাম সর্দারকে যথাযথভাবে দাফন করা হয়েছে। হয়তো তার জন্য মিলাদও হবে। দুই পুত্র এবং দুই কন্যা মিলে হয়তো বাবার বিদেহী আত্মার শান্তির জন্য মিলাদে লোকজন দাওয়াত করে ‘ডাল-চালও’ খরচ করবেন। কিন্তু জীবন বাঁচাবার জন্য সন্তান তাঁকে দুমুঠো ডাল-ভাত দেয়নি। বরং এক প্রকার তাড়িয়ে দেয় ক্ষুধার্ত বৃদ্ধ বাবাকে। হায় সন্তান! হায় জীবন!!